‘বরুণ ফুল’—যেন আছড়ে পড়ছে মৃদু সাদা-হলুদের ঢেউ

· Prothom Alo

অনেকটা ‘আবার আসিব ফিরে’ ধরনের গাছটিতে আবারও ডালে ডালে ফুল ফিরে এসেছে—ফুল ফুটেছে। অসংখ্য ফুল এসেছে বরুণের গাছে। বছর ঘুরে বরুণ ফুলের এমন ফেরাটা এ রকমই মনে হয় রাজকীয়, এ রকমই উচ্ছল-উজ্জ্বল। সকালের আলোয় তখন গাছটি ডুবে আছে—এর মধ্যেই গাছে চলছে ফুলের বন্যা। প্রতিটি শাখায়—পাতার ফাঁকে প্রদীপের মতো জ্বলছে সাদা-হালকা হলুদ, বেগুনি আঁচ নিয়ে বরুণের ফুলগুলো।

গাছভর্তি শুধু ফুল, ফুলের মেলা—ফুলের তরঙ্গ। শাখাসমূহ থেকে আছড়ে পড়ছে বরুণ ফুলের ঢেউ। এখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো মিঠে রোদ জেগে আছে। সকালটাতে বসন্তের মৃদু হাওয়া বইছে—খসে পড়ছে সাদা-হলুদমাখা পাপড়ি দল।

Visit bettingx.club for more information.

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আছে, ‘—সেখানে বরুণ কর্ণফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা জলাঙ্গীরে দেয় অবিরল জল;’—সেখানে মনু নেই। তবু শহরের ভেতর মনু নদের তীরের একটুকরা খালি জায়গার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি বরুণগাছ। বরুণ জলাভূমি এলাকার গাছ। হয়তো কোনো একদিন মনু নদের জলের স্রোতে অন্য কোথাও থেকে ভেসে আসা বরুণের বীজ এখানে মাটিকে আশ্রয় করেছে। শিকড় ছড়িয়ে তারপর ধীরে ধীরে অঙ্কুর গজিয়েছে—বেড়ে উঠেছে।

ঘাসের বুকে ঝরে পড়েছে পাপড়ি । শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের মনু নদের পাড়ে

কারও যত্নের দরকার পড়েনি, কারও হাতের ছোঁয়া লাগেনি—প্রাকৃতিক নিয়মে একদিন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বরুণগাছটি। সবার অলক্ষ্যে ফুল ফুটেছে, ফুল হেসে উঠেছে। অনেকটা বছর ধরে মৌলভীবাজার শহরের সৈয়ারপুর ফরেস্ট অফিস রোডের ভৈরব থলির কাছে বসন্তকালে বরুণের গাছটি ফুলের ঐশ্বর্য নিয়ে ফিরে আসে—এবারও ফিরেছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার শহরের ফরেস্ট অফিস রোড ধরে পথ চলতে মনু নদের পাড়ে এই বরুণগাছটির সঙ্গে দেখা, ঝোপালো গাছটিতে পাতার চেয়ে ফুলই অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে। শাখা-প্রশাখায় পাতা ছাপিয়ে উছলে পড়ছে ফুল। পাহাড়ের বুক চিরে যেমনটা বেরিয়ে আসে ঝরনার জল—ফুলগুলো অনেকটা তেমনই পাতার ভুবন থেকে ঢেউ খেলে জেগে উঠছে, দুলছে। গাছটি মাটি থেকে কয়েক ফুট উচ্চতায় উঠে দুটি শাখা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। দুটি বাহুর মতো বড় দুটি শাখা থেকে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা তৈরি হয়েছে, ছড়িয়ে আছে। সারা গাছে এখন ফুল ফুটেছে। গাছের নিচে ‘মধুকূপী ঘাসে অবিরল’ ঝরে পড়েছে ফুলের পাপড়ি—টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে।

সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলার কাউয়াদীঘি হাওর এলাকায়ও এ রকম বেশ কিছু বরুণগাছের দেখা মিলেছে। একটা সময় হাওরপারে বরুণগাছের প্রাচুর্য ছিল—এখন হয়তো সে রকম নেই। তবু এখনো অনেকগুলো গাছ টিকে আছে। হাওরপারের বিভিন্ন গ্রামের বাড়ির আশপাশ, খালের পাড়, খালি জায়গার বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু বরুণগাছের দেখা পাওয়া গেছে। প্রায় সব কটি গাছই ফুলের প্রাচুর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এটাই হাওরপারের প্রকৃতি—হাওরপারকে আরও সুন্দর, আরও মধুর-মায়াবী করে রেখেছে এখন এই গাছগুলো। হাওর-বাঁওড় কিংবা জলাভূমির কাছে বরুণগাছের দেখা পাওয়াটা স্বাভাবিক—কিন্তু শহরের ভেতর জলাভূমির অমন গাছ অনেকটা বিরল এখন।

বরুণগাছের সবচেয়ে পছন্দের আবাস হচ্ছে জলাভূমি এলাকা। জলাভূমির কাছেই তার বেড়ে ওঠা, সময় যাপন। হাওর-বাঁওড়, নদ-নদীর পাড়ই তার প্রিয় ভূমি। ফুলটির পোশাকি নাম বরুণ হলেও আরও অনেক নাম আছে তার। বৈন্যা, শ্বেতপুষ্প, কুমারক, সাধুবৃক্ষ, শ্বেতদ্রুম—হয়তো স্থানভেদে আরও কোনো নাম আছে বরুণের। প্রচলিত ইংরেজি নাম হচ্ছে স্পাইডার ট্রি, টেম্পল প্লান্ট ও গার্লিক পিয়ার।

বরুণ হচ্ছে ছোট থেকে মাঝারি আকারের একটি বৃক্ষ। বাকল ধূসর-বাদামি ও মসৃণ। গাছ সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। তবে হাওরপারের কোনো কোনো জনপদে হঠাৎ অনেক বড় ও বয়সী বরুণগাছের দেখা পাওয়া যায়। ফুলের মুক্ত পাপড়ি ৪টি, পুংকেশর ২০ থেকে ২৫টি, প্রায় ৪ সেন্টিমিটার লম্বা ও বেগুনি হয়ে থাকে। ফল গোলাকার বা ডিম্বাকার, শক্ত শাঁসাল। বীজ ও শিকড় থেকে চারা হয়।

গ্রামবাংলায় গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে যে বনফুলটি বেশি চোখে পড়ে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বরুণ। বরুণ হাওরপারে ‘গ্রীষ্মের বনফুল’। গাছ ভরা থাকে অফুরন্ত ফোটা ফুলে। সাদা ও হালকা হলুদ বর্ণের ফুলের পসরা মাসখানেক ধরে থাকে। বর্ষায় গাছ পানিতে ডুবে গেলেও সমস্যা হয় না—ভালোভাবেই টিকে থাকে।

প্রাচীনকাল থেকেই বরুণ ভেষজ গাছ হিসেবে পরিচিত। কাঁচা ফল রান্না করে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। ফুল ঝরে যাওয়ার পরপরই গাছে ফল আসে। ফল দেখতে অনেকটা কতবেলের মতো। দূর থেকেই গোল গোল ফল চোখে পড়ে। বরুণের আদি আবাস ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

Read at source