ক্ষমতার তিন মাথা ভাঙার পথ কী

· Prothom Alo

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও অবকাঠামোগত অর্জনে এক বিস্ময়কর পথ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির পিঠাপিঠি যে অন্ধকার ছায়া রাষ্ট্র ও সমাজকে ভেতরে-ভেতরে ক্ষয় করছে, তা হলো দুর্নীতি। অনেক বিশ্লেষণে দুর্নীতিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একটু নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশে দুর্নীতি এখন শুধু আর আইনি বা প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এটি যেন অনেক ক্ষেত্রে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

Visit syntagm.co.za for more information.

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে গত কয়েক বছরে দুদককে শক্তিশালী করা, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার বা আইনি স্বচ্ছতার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বড় প্রশ্ন হলো, কেন দুর্নীতি থামছে না? কেন বারবার একই চক্র ফিরে আসছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে দুর্নীতি এখন সামাজিকভাবে অনেকটা ‘সহনীয়’ হয়ে গেছে। মানুষ মনে মনে দুর্নীতিকে অপছন্দ করলেও বাস্তব জীবনে এর সঙ্গে নিঃসংকোচে আপস করে নিচ্ছে।

শৈশব থেকে যে দুর্নীতির হাতেখড়ি

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নৈতিকতা নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের দুর্নীতির শিকড় সেখানেই ছড়িয়ে আছে। কয়েক বছর ধরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি নিয়মিত কলঙ্কজনক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আমরা যখন এ নিয়ে আলাপ করি, তখন অপরাধী চক্র বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হই। কিন্তু প্রশ্ন তোলা হয় না—ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের ক্রেতা আসলে কারা? বাস্তবতা অতি নির্মম। সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো ফল করানোর জন্য খোদ অনেক অভিভাবকই ব্যাকুল হয়ে এসব প্রশ্নপত্র কেনেন।

সন্তানের ‘এ প্লাস’ প্রাপ্তির স্বপ্নে বুঁদ হয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন না যে তাঁরা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ তৈরি করছেন না, বরং তাকে অনৈতিকতার এক অন্ধগলিতে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। যে শিশু তার অভিভাবককে দেখল অসৎ পথে ফল পাওয়ার আয়োজন করতে, সে ছোটবেলা থেকেই এক ভয়াবহ শিক্ষা নিয়ে বড় হয়—জীবনের যেকোনো জায়গায় সফল হতে গেলে নৈতিকতা নয়, ‘শর্টকাট’ পথই কাম্য। এই শিশু যখন কর্মক্ষেত্রে ঢোকে, তখন ঘুষ দেওয়া বা নেওয়া তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। এভাবেই একটি  দুর্নীতির সংস্কৃতি বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক শিকড় ও দুষ্টচক্রের উৎস

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক উপাদান দুর্নীতিকে শক্তিশালী করে চলেছে। প্রথমটি হলো পৃষ্ঠপোষক ও আনুগত্যের রাজনীতি। ক্ষমতাধর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন ক্ষমতার বিনিময়ে অন্যকে অনৈতিক সুবিধা দেন, তখন সেটি সামাজিক নিরাপত্তা বা মানবিকতা হিসেবে দেখার ভুল করি আমরা। কোনো যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে নিজ প্রভাব খাটিয়ে একজনের চাকরির সুপারিশ করাটা মূলত দুর্নীতির একটি সুচারু কাঠামো, যা পরবর্তী সময়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যেখানে প্রত্যেকেই কাউকে না কাউকে ব্যক্তিগত অনানুষ্ঠানিক সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা অনুভব করেন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামোয় নৈতিকতা নয়, বরং অর্থই হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্মানের একমাত্র মাপকাঠি। যে ব্যক্তি দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল অর্থ বানাচ্ছেন, তিনিই সামাজিকভাবে বড় দাতা বা সমাজসেবী হিসেবে সম্মান পাচ্ছেন। এমনকি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দ্বিধায় এই কালোটাকার দান গ্রহণ করছে। বিয়ের বাজারেও পাত্রের আয়ের উৎসের চেয়ে পরিমাণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। এই সামাজিক স্বীকৃতি দুর্নীতির পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

তৃতীয়ত, আমাদের সমাজে ধর্মীয় চর্চার আধিক্য থাকলেও সেখানে অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকতার চেয়ে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ধর্মীয় চিহ্ন ব্যবহার করে বা নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করে নিজেদের দুর্নীতির দাগ মুছে নিচ্ছেন। সচেতনতার অভাব এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকেও হাতিয়ার করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। ভূমি অফিস থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরগুলোয় যে হয়রানি চলে, তার মূলে রয়েছে তথ্যের অবাধ প্রবাহের অভাব।

‘আয়রন ট্রায়াঙ্গল’: ক্ষমতার তিন মাথা

বাংলাদেশে দুর্নীতির একটি শক্ত গিট হলো—রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী মহলের এক অবিচ্ছেদ্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক; রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যাকে ‘আয়রন ট্রায়াঙ্গল’ বলা হয়। বড় বড় প্রকল্পের নীতিনির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত—এ চক্র পরস্পরকে সুরক্ষা দিয়ে যায়। বৃহৎ দুর্নীতির জন্য যখন নীতিনির্ধারণী নমনীয়তা দেখানো হয়, তার ছায়ায় তৃণমূলে হাজারো ছোট ছোট দুর্নীতির বীজ রোপিত হয়। এই আঁতাতই আমাদের প্রশাসনিক সংস্কারগুলোকে অকার্যকর করে রাখে।

চক্র ভাঙার পথ কী

আইন করে বা জেল-জুলুম দেখিয়ে একটি সংস্কৃতিকে নির্মূল করা অসম্ভব। আইনি ব্যবস্থা একটি সীমারেখা তৈরি করতে পারে, কিন্তু মানুষের মানসিক পরিবর্তন আসে ঘর থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। যদি শিক্ষা শুধু ভালো গ্রেড আর সার্টিফিকেট অর্জনের দৌড় হয়, তবে সমাজ নীতিমান নাগরিক পাবে না। আমাদের অভিভাবক ও সমাজকে উপলব্ধি করতে হবে যে অনৈতিকভাবে অর্জিত সাফল্য আদতে এক বড় ব্যর্থতা।

এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা অনেক সময় নৈতিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়। শিক্ষা যদি শুধু নম্বর পাওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেখানে সততা ও নৈতিকতার গুরুত্ব কমে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাই শুধু ভালো ফল নয়, বরং সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক আচরণের ওপরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে যে সন্তানের প্রকৃত সাফল্য কেবল ভালো গ্রেডে সীমাবদ্ধ নয়। সততা ও নৈতিকতা ছাড়া সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দুর্নীতির বড় বড় কেলেঙ্কারির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট দুর্নীতির ঘটনাগুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় এই ছোট ছোট আচরণই বড় দুর্নীতির ভিত্তি তৈরি করে।

একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের সৎ মানুষের সমাজে পরিণত হয়, যখন মানুষ শুধু আইনের ভয়ে নয়, নিজের বিবেকের তাগিদেও অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকে। বাংলাদেশ যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে টেকসই সাফল্য অর্জন করতে চায়, তাহলে আমাদের সেই সামাজিক মানসিকতাই গড়ে তুলতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি কেবল আইন দিয়ে নয়, সংস্কৃতি দিয়েই টিকে থাকে। আর সংস্কৃতি বদলাতে পারলেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই সত্যিকার অর্থে সফল হতে পারে।

  • নুরুল হুদা সাকিব  অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read at source