পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে বছরে ৮ কোটি টাকা মুনাফা সোলশেয়ারের

· Prothom Alo

মোকাররম হোসেন, গাজীপুরের পুবাইল থানার ইজিবাইক গ্যারেজের স্বত্বাধিকারী। গত বছর তাঁর গ্যারেজের সব কটি ইজিবাইক চলত লেড অ্যাসিড ব্যাটারিতে। বছর না যেতেই এসব লেড অ্যাসিড ব্যাটারি কার্যক্ষমতা হারায়। তাই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি দিয়ে ইজিবাইক চালানোর কথা ভাবেন তিনি। এতেও সমস্যা। কারণ, লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির দাম বেশি।

ইজিবাইকের ব্যাটারিতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ ভেবে কোনো ব্যাংক বা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাও এ খাতে ঋণ দেয় না। এ রকম অবস্থায় ইজিবাইক গ্যারেজের মালিককে ব্যাংকঋণের মাধ্যমে লিথিয়াম ব্যাটারি পেতে সহায়তা করে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান সোলশেয়ার।

Visit playerbros.org for more information.

মূলত স্টার্টআপ সোলশেয়ার লিথিয়াম ব্যাটারির সঙ্গে আলাদা করে যুক্ত করেছে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) চিপ। এই চিপের মাধ্যমে পে অ্যাজ ইউ গো (পিএওয়াইজি) মডেলে সোলশেয়ার চাইলে এই ব্যাটারির চার্জিং ও কার্যক্ষমতা বন্ধ করে দিতে পারে। তাই ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকি ছাড়া ঋণ দিতে পারে।

সোলশেয়ারের এই উদ্যোগের নাম সোলমবিলিটি। এই সেবা নিতে একজন ইজিবাইকচালককে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া সোলমবিলিটির মাধ্যমে একজন গ্যারেজমালিক চাইলে এককালীন টাকা ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ–চালিত চার্জিং স্টেশনও স্থাপন করতে পারেন।

এ নিয়ে ইজিবাইক গ্যারেজের মালিক মোকাররম হোসেন বলেন, লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার সাশ্রয়ী ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। ফলে আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। আর তাঁদের মাধ্যমে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা ছাড়া লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা যাচ্ছে।

সোলশেয়ারের অবশ্য আরও তিনটি উদ্যোগ রয়েছে। এর একটি উদ্যোগের নাম সোলগ্রিড। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চাইলে একজন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী তাঁর অব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারেন। আর তাঁদের আরেক উদ্যোগ হলো সোলরুফ। এর মাধ্যমে চাইলে কোনো প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ–প্রযুক্তি সোলশেয়ারের মাধ্যমে স্থাপন করতে পারবেন। এতে সোলশেয়ারের ব্যবসার বিকাশ ঘটে। যেমন প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনুদান ও পুরস্কার বাবদ ৭৭ লাখ ডলার পেয়েছে।

সোলশেয়ারের উপনির্বাহী কর্মকর্তা আজিজা সুলতানা বলেন, ‘পুরো বিশ্বে টেসলা ও বিওয়াইডি মিলে হয়তো ৪০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে। তবে আমাদের দেশে প্রায় ৫০ লাখ ইজিবাইক রয়েছে। এদের সবার বিদ্যুতের একটি স্টোরেজ রয়েছে। বর্তমানে আমরা প্রায় ৩০০ ইজিবাইকে এই প্রযুক্তিসেবা দিয়েছি। এসব ব্যাটারি গ্যারেজে ফেরার সময় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নিয়ে ফিরে আসে। বড় আকারে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যতে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও ব্যবহার করা যাবে।’

সোলশেয়ারের পণ্য ও বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক ইসা আবরার আহমেদ বলেন, ‘একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি চার বছর কর্মক্ষম থাকে। তবে এটির দাম লেড এসিড ব্যাটারির চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এ জন্য আমরা বিভিন্ন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর এই ব্যাটারিতে আমাদের প্রযুক্তি সংযোজনের ফলে আমরা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। চাইলেই আমরা সেই ব্যাটারির কার্যক্ষমতা বন্ধ করে দিতে পারি।’

সেবাস্তিয়ান গ্রোহ, প্রতিষ্ঠাতা, সোলশেয়ার

যেভাবে সোলশেয়ারের যাত্রা শুরু

সোলশেয়ারের যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে সোলগ্রিড উদ্যোগের মাধ্যমে। সোলশেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহ একজন জার্মান নাগরিক। তিনি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় জ্বালানির ভূমিকা, জ্বালানি দারিদ্র্য ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিষয়ে পিএইচডি করেন। সে সময় গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। সেবাস্তিয়ান গ্রোহ দেখেন, এ দেশে প্রায় ৪০ লাখ সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থা রয়েছে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় না। তখন পিয়ার-টু-পিয়ার (ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি) এনার্জি এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে ব্যবহারের কথা তাঁর মাথায় আসে।

পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালে সেবাস্তিয়ান গ্রোহ আবার বাংলাদেশে আসেন এবং সোলশেয়ার নামে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ‘সোল গ্রিড’ নামের আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই উদ্যোগ শুরু করেন। তখন সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পায়। তাঁর উদ্যোগের ফলে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, সেসব জায়গায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পান। তবে ২০২২ সালে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছে যায়। এর ফলে এই সেবার চাহিদা কমে যায়।

২০২২ সালে নতুন উদ্যোগ নিয়ে আসে ‘ই মোবিলিটি’। তারপর প্রতিষ্ঠানটি তাদের আরেক উদ্যোগ সোল রুফ নিয়ে আসে। সব ব্র্যান্ড ও কারখানারই এখন নেট-জিরো কার্বন অর্জনের লক্ষ্য আছে। তবে সেই লক্ষ্যে পূরণের চাপ কম নয় এবং এটি ব্যয়বহুলও। পরিচালনায় প্রযুক্তিগত দক্ষতাও লাগে। এখানেই সোলশেয়ার সুবিধা দেয়।

এ ছাড়া ২০২৩ সালে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান বেস্টসেলার ও সোলশেয়ার যৌথভাবে গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই) চালু করে। এর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের থেকে এই প্রযুক্তি কিনে নিতে পারবে। বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ এই অব্যবহৃত বিদ্যুৎ জাতীয়ভাবে বিক্রি করতে পারেন না। তবে এ নিয়ে কোনো নীতিমালা হলে এই বিদ্যুৎ বিক্রি করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত সোলশেয়ার ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। আরও ৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আরও ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করবে সোলশেয়ার।

Read at source