মহররমকে কেন ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়

· Prothom Alo

বাঙালি মুসলিম সমাজে এই মাস এলেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে কারবালার ঘটনা ও আশুরার শোক। কিন্তু এই আবেগের আড়ালে প্রায়ই ঢাকা পড়ে যায় মহররমের মূল ফিকহি ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।

Visit bettingx.bond for more information.

কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই ইসলামে এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে। ১২টি মাসের মধ্যে শুধু এই মাসটিই এই মর্যাদা পেল কেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এই লেখার উদ্দেশ্য।

সম্মানিত চার মাস

মহররমের ফিকহি মর্যাদার ভিত্তি পবিত্র কোরআনে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই ১২টি মাসের মধ্যে চারটি মাসকে তিনি সম্মানিত করেছেন। (সুরা তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)

মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে এই চার মাসের পরিচয় দিয়েছেন: জিলকদ, জিলহজ ও মহররম—এই তিনটি পরপর; আর চতুর্থটি হলো রজব। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৬২)

ইসলামি পরিভাষায় এগুলোকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বলা হয়। প্রাক-ইসলামি আরবেও এই মাসগুলোতে যুদ্ধ বন্ধ রাখার রীতি ছিল; ইসলাম এই পবিত্রতাকে সুসংহত করেছে।

‘আল্লাহর মাস’ মহররম: কিছু করণীয় ও বর্জনীয়

ফিকহবিদদের মতে, এই মাসগুলোতে ইবাদতের সওয়াব যেমন বেশি, পাপের ভার তেমনি বেশি গুরুতর। (ইমাম ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/১৪৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

‘আল্লাহর মাস’ নামকরণের কারণ

রমজান বা জিলহজের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস থাকা সত্ত্বেও মহানবী (সা.) মহররমকে বিশেষভাবে ‘আল্লাহর মাস’ বলে সম্বোধন করেছেন। হাদিসে এসেছে: রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে কোনো কিছুকে আল্লাহর নামের সঙ্গে যুক্ত করাকে—যেমন বায়তুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) বা নাকাতুল্লাহ (আল্লাহর উট)—‘তাশরিফ’ বা সম্মান প্রদর্শন বলা হয়।

ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, মহররমকে আল্লাহর মাস বলার কারণ হলো এই মাসের পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারিত। প্রাক-ইসলামি আরবে পৌত্তলিকেরা নিজেদের সুবিধামতো পবিত্র মাসের হিসাব পরিবর্তন করত—একে ‘নাসি’ বলা হতো। আল্লাহ মহররমের আদি পবিত্রতাকে পুনরুজ্জীবিত করে এর মর্যাদা নিশ্চিত করেছেন। (ইমাম ইবনু রাজাব আল-হাম্বলি, লাতাইফুল মাআরিফ, ১/৩৪, দার ইবনে হাজম, বৈরুত, ২০০৪)

কারবালা-ট্র্যাজেডি যেভাবে বদলে দেয় আরবের ভূরাজনীতি

মহররমের প্রধান ইবাদত

মহররম মাসের প্রধান ইবাদত হলো রোজা। পুরো মাস নফল রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে, তবে আশুরার দিনের রোজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। মহানবী (সা.) বলেছেন, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের পাপের কাফফারা হিসেবে কবুল হওয়ার আশা রাখা যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

তবে ফিকহের দৃষ্টিতে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ইহুদিরা শুধু ১০ মহররম একটি রোজা রাখত।

মুসলিমদের পৃথক ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখতে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন ১০ মহররমের সঙ্গে তার আগের দিন (৯ মহররম) বা পরের দিন (১১ মহররম) আরও একটি রোজা যুক্ত করতে। হাদিসে এসেছে: আগামী বছর বেঁচে থাকলে নবম তারিখেও রোজা রাখব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)

ফিকহবিদদের মতে শুধু একটি রোজা রাখা মাকরুহ, দুটি রোজাই পূর্ণ সুন্নত।

কুসংস্কার ও ভুল ধারণা

উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে মহররমকে অনেকে ‘অশুভ মাস’ বলে মনে করেন এবং এই মাসে বিয়েশাদি বা শুভ কাজ এড়িয়ে চলেন। এটি ইসলামের আকিদার পরিপন্থী। ইসলামে কোনো দিন বা মাসকে স্বতঃসিদ্ধভাবে অশুভ মনে করার কোনো সুযোগ নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৫৭)

কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য নিঃসন্দেহে গভীর বেদনার, কিন্তু মহররমের মূল ধর্মীয় মর্যাদা কারবালার ওপর নির্ভরশীল নয়।

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের বহু আগেই এই মাস পবিত্র ও ফজিলতপূর্ণ ছিল। শোকের আবেগ ও ইবাদতের শিক্ষা—এই দুটোকে এক করে ফেললে উভয়েরই ক্ষতি হয়।

কেন ৪ মাসকে ‘হারাম’ মাস বলে

Read at source