পারমাণবিক বিপর্যয় হলে কেন সূর্যমুখীর গাছ লাগানো হয়

· Prothom Alo

২০১১ সালের ১১ মার্চ। জাপানে তখন বেলা ২টা ৪৬ মিনিট। প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হানা প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে জাপানের পূর্ব উপকূল। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরপরই ধেয়ে আসে সুনামি। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মিয়াগি ও ফুকুশিমা অঞ্চলে ভূমিকম্প–সুনামিতে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ট্র্যাজেডি সেখানেই শেষ হয়নি। এরপর ওকুমার ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একে একে ভয়াবহ সব বিস্ফোরণ ঘটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাতাসের সঙ্গে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য।

Visit betsport24.es for more information.

জাপানিদের কাছে এ ঘটনার প্রভাব আজও রয়েছে। জাপান সরকার এখনো প্রায় ১০ লাখ টন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পানি ও বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য কীভাবে নিরাপদ করা যায়, তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিশাল পরিবেশসংকট মোকাবিলায় বড় বড় আধুনিক প্রযুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে। তবে পারমাণবিক বিপর্যয় ঠেকাতে কাজ করছে সূর্যমুখী ফুল। পারমাণবিক দুর্ঘটনা কিংবা মারাত্মক দূষণের জায়গায় যেখানে অন্য কোনো গাছ বাঁচতে পারে না, সেখানেও পরিবেশকে বিষমুক্ত করছে এই সূর্যমুখী।

জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লি

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক মাস পরের কথা। পার্শ্ববর্তী বৌদ্ধমন্দিরের প্রধান ভিক্ষু কোয়ু আবে রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁরা ওই এলাকায় ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী, শর্ষে ও মোরগফুল লাগিয়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই গাছগুলো মাটি থেকে তেজস্ক্রিয়তা শুষে নিতে পারে। তখন পর্যন্ত তাঁরা প্রায় দুই লাখ ফুল ফুটিয়েছিলেন ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিলি করেছিলেন আরও কয়েক লাখ বীজ। ধারণা করা হয়, ফুকুশিমায় ফোটা প্রায় ৮০ লাখ সূর্যমুখীর উৎস ছিল সেই মন্দিরটিই।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব: জাপানি চিপসের প্যাকেট থেকে হারিয়ে গেছে রং

তবে মাটি পরিষ্কারের এই পদ্ধতি কেবল কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা লোককথা নয়। এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। পরিবেশ থেকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সরাতে সূর্যমুখী যে কতটা কার্যকর, তা প্রথম প্রমাণিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল বিপর্যয়ের সময়। সেখানে বিপুল পরিমাণে সূর্যমুখী রোপণ করে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল।

২০১১ সালের একটি সাক্ষাৎকারে মৃত্তিকাবিজ্ঞানী মাইকেল ব্লেলক জানান, সূর্যমুখীগাছ নির্দিষ্ট কিছু তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ নিজের ভেতর টেনে নিতে ভীষণ দক্ষ। চেরনোবিলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় এই ফুল চাষ করেই তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব কমানো সম্ভব হয়েছিল। মূলত এই বৈজ্ঞানিক সাফল্যের কারণেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে এখন সূর্যমুখীর এমন চাষাবাদ দেখা যায়।

১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিল দুর্ঘটনার পর চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছবি

কিন্তু এত ফুল থাকতে কেন সূর্যমুখী ফুল বিজ্ঞানীরা পছন্দ করলেন? পরিবেশ পরিষ্কার করার জন্য সূর্যমুখীকে বেছে নেওয়ার কারণ এর সৌন্দর্য নয়; বরং এর কিছু বিশেষ গুণ। এই গাছ খুব দ্রুত বড় হয় এবং প্রায় যেকোনো ধরনের মাটিতে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তবে সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হলো, সূর্যমুখী মাটি থেকে বিষাক্ত পদার্থ শুষে নিয়ে তা নিজের পাতা ও কাণ্ডে জমা করে রাখে। এর ফলে তেজস্ক্রিয়তা দূর করার জন্য পুরো গাছের শিকড় উপড়ে মাটি খুঁড়তে হয় না। শুধু ওপরের অংশটুকু কেটে নিলেই চলে।

প্রকৃতির এই পরিচ্ছন্নতাকারী গাছকে বিজ্ঞানীরা বলেন ফাইটোরেমিডিয়েশন। চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর মাটি ও পানি থেকে ক্ষতিকর সিজিয়াম ও স্ট্রনশিয়াম দূর করতে এই পদ্ধতি দারুণ কাজে দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এই তেজস্ক্রিয় মৌলগুলো দেখতে অনেকটা গাছের প্রিয় খাবারের মতো। সিজিয়াম দেখতে পটাশিয়ামের মতো, যা গাছের সালোকসংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন। আর স্ট্রনশিয়ামকে গাছ ভুল করে ক্যালসিয়াম ভেবে শুষে নেয়, যা এর কাঠামোগত বৃদ্ধির জন্য দরকার। সহজ কথায়, পুষ্টির লোভে সূর্যমুখীগাছ এই বিষাক্ত মৌলগুলোকে নিজের শরীরে টেনে নেয়।

শরীর থেকে খসে পড়া চামড়া থেকে যেভাবে তৈরি হয় ঘরের ধুলা

বিজ্ঞানীদের মতে, পানি পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিটি চমৎকার কাজ করে। তবে মাটির ভেতরে সিজিয়ামের রাসায়নিক গঠন কিছুটা জটিল হওয়ায় সেখানে কাজটা একটু কঠিন। তা সত্ত্বেও সঠিক পরিবেশ ও পরিকল্পনা থাকলে ফুকুশিমার মাটি থেকেও ক্ষতিকর দূষক পদার্থ সরাতে এই সূর্যমুখীগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চেরনোবিলে দারুণ সফল হলেও ফুকুশিমার ক্ষেত্রে সূর্যমুখীর এই বিশেষ অভিযান আশানুরূপ ফল দিতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি গবেষণা না হলেও বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, ফুকুশিমার মাটিতে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের মাত্রা কমাতে পারে, এমন কোনো গাছ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এর পেছনে আরেকটি কারণও ছিল। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার ভৌগোলিক গঠন ছিল একেবারেই আলাদা।

মৃত্তিকাবিজ্ঞানীরা বলেন, চেরনোবিলে তাঁরা কাজ শুরু করেছিলেন বিপর্যয়ের বেশ কয়েক বছর পর। তত দিনে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। কিন্তু ফুকুশিমার মাটির ধরন ছিল অন্য রকম। বিশেষ করে যেসব মাটিতে এবং একধরনের শক্ত কাদামাটির পরিমাণ বেশি থাকে, সেখানে সিজিয়াম একবার গেঁথে গেলে তাকে টেনে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মূলত মাটির এই ভিন্নতার কারণেই ফুকুশিমায় সূর্যমুখী এর স্বাভাবিক ক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্সশহরের তাপমাত্রা কমাতে গাছের ক্ষমতা আসলে কতটুকু

Read at source