‘আমি কখনো অশালীনতার পথে যাই না’
· Prothom Alo

আবারও কমেডির চেনা ছন্দে ফিরেছেন রাজপাল যাদব। প্রিয়দর্শন পরিচালিত ভূত বাংলায় তাঁকে পুরোনো রূপে পাওয়া গেল। এ সিনেমার সূত্রে অভিনয়দর্শন, কমেডির ব্যাকরণ আর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। ‘ভূত বাংলা’র প্রযোজক একতা কাপুরের জুহুর কৃষ্ণা বাংলোয় এই অভিনেতার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দিলেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্য
Visit esporist.org for more information.
দীর্ঘদিন ধরে বলিউডে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দর্শকদের হাসিয়ে আসছেন রাজপাল যাদব। কখনো সরল গ্রাম্য যুবক, কখনো বিভ্রান্ত সহকারী, আবার কখনো অদ্ভুত সব পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ—পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই আলাদা এক বিনোদন। তবে এই হাসির আড়ালে যে দীর্ঘ অনুশীলন, অভিনয়কে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা আর নিরন্তর শেখার মানসিকতা কাজ করে, আড্ডায় সেসবও উঠে এল।
প্রিয়দর্শনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাজপাল যাদব বলেন, ‘কাজ করতে করতে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই আপনি যখন লাগাতার কাজ করেন, তখন অনেক কিছু শেখা হয়, শব্দে যা প্রকাশ করা যায় না। একটা টিউনিং তৈরি হয়, যেটা অনুভব করা যায়। প্রিয়জি আমার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে।’ তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্কের রসায়ন আরও পরিণত হয়েছে। প্রিয়দর্শনের সঙ্গে সাম্প্রতিক কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও উচ্ছ্বসিত ছিলেন এই অভিনেতা, ‘২০ বছর আগে হাঙ্গামার সময় যে এনার্জি দেখেছিলাম, এখন তার ১০ গুণ বেশি দেখেছি। উনি ভীষণ ভদ্র মানুষ এবং প্রতিটি চরিত্রকে পূর্ণতা দেন। ওনার সিনেমায় সব সময় শেখার সুযোগ থাকে।’ হাসতে হাসতেই যোগ করেন, ‘আমরা তখন একেবারে নতুন ছিলাম আর এখন আমরা “ওয়েল-নোন বিগিনার”—শেখার প্রক্রিয়া এখনো চলছে।’
কমেডিকে অনেকেই সহজ মনে করলেও দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার প্রাক্তন শিক্ষার্থী রাজপালের মতে, বিষয়টি ঠিক উল্টো। তিনি বলেন, ‘কমেডি কখনো জোর করে করা যায় না, এটা ভেতর থেকে স্বাভাবিকভাবে আসতে হয়। এখানে সঠিক টাইমিং খুব জরুরি। আমি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে শারীরিক ভাষা এবং নবরসের সূক্ষ্ম ব্যবহার করি।’ তাঁর ভাষায়, ‘বিনোদন শুধু কমেডি বা ট্র্যাজেডি নয়, এটি একধরনের বিজ্ঞান, যাকে বুঝে শিখতে হয়। যত গভীরভাবে বুঝবেন, তত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।’
চার্লি চ্যাপলিন, গোবিন্দ, রজনীকান্ত ও জ্যাকি চ্যান রাজপালের প্রিয় কমেডিয়ান। তিনি বলেন, ‘ওঁরা যেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার—যেখানে দাঁড়ান, সেখানেই অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করেন।’
শুধু কমেডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না রাজপাল যাদব। সিরিয়াস চরিত্রেও নিজেকে প্রমাণ করতে চান। ‘ম্যায় মেরি পত্নী অউর ওহ’ ছবির প্রসঙ্গ টেনে অভিনেতা বলেন, ‘আমি সব সময় সমতা বজায় রেখে কাজ করতে চাই—দর্শকের পছন্দও রাখতে চাই, আবার নিজের পছন্দের কাজও করতে চাই।’
প্রিয়দর্শনের পাশাপাশি নিজের অভিনয়জীবনে রাম গোপাল ভার্মা ও ডেভিড ধাওয়ানের অবদানও বিশেষভাবে স্মরণ করেন রাজপাল। তাঁর ভাষায়, ‘এই তিন পরিচালক আমার ওপর প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, যার ৯৯ শতাংশই সফল হয়েছিল।’ ‘চুপচুপকে’, ‘মালামাল উইকলি’ ও ‘ঢোল’–এর মতো ছবিতে সেই পরীক্ষার সফল ফলও দেখা গেছে।
কমেডির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাজপাল যাদব বলেন, ‘আমি সেই সংলাপ খুঁজি, যেখানে একটা বাচ্চা, একজন যুবক আর একজন বৃদ্ধ—সবাই সমানভাবে হাসবে। যদি দর্শক না হাসে, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও ঘাটতি আছে।’ তাঁর মতে, ‘যে সিনেমায় খাঁটি হাসি থাকে, সেটাই “ক্লাস সিনেমা”।’
অশালীনতা এবং ভালো কমেডির পার্থক্য নিয়েও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো অশালীনতার পথে যাই না। কমেডি এমন হওয়া উচিত, যা সবাই উপভোগ করতে পারে।’ একইভাবে ‘ইমপ্রোভাইজেশন’ প্রসঙ্গে তাঁর মত, ‘সংলাপ বদলে ফেলা নয়, বরং লেখা সংলাপের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করাই আসল ইমপ্রোভাইজেশন।’
সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও স্মৃতিচারণা করেন তিনি। অক্ষয় কুমার ও পরেশ রাওয়ালের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতাকে শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন রাজপাল। পাশাপাশি প্রয়াত অভিনেতা আসরানির সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তও এখনো মনে গেঁথে আছে, ‘একসঙ্গে বসে গাজরের হালুয়া খাওয়ার স্মৃতি কি ভুলতে পারব!’
আড্ডা শেষে জানতে চাইলাম, সফলতার মূলমন্ত্র কী তাঁর কাছে? বলেন, ‘যে বিনোদনকে ছাত্রের মতো শিখতে চায়, সে-ই সফল হয়। যারা ভাবে, “আমি তো পারি”, তারা এগোতে পারে না। তাই শেখার মানসিকতা সব সময় থাকতে হবে। যে শেখে, সে–ই টিকে থাকে।’ তাঁর এই উপলব্ধিই যেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সারাংশ—হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠোর অনুশীলন, আত্মনিবেদন এবং শিল্পকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা।