উপাচার্যের বদল কেন হয়, কীভাবে হয়

· Prothom Alo

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে উপাচার্য নিয়োগ হতে দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের মধ্যে যাঁদের আমি চিনি, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজে দারুণ দক্ষতা রয়েছে। নিশ্চয় তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার বলেই এই নিয়োগ পেয়েছেন। এ জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানাই। আশা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। কিন্তু উপাচার্য বদলের প্রয়োজন কেন হয় কিংবা কীভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, সেটি একটি প্রশ্ন বটে।

উপাচার্য, সহ–উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন, প্রভোস্ট—এগুলো কোনোভাবেই রাজনৈতিক পদ নয়। অথচ দেখা যায়, ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন হতে থাকে। উপাচার্য নিয়োগের ব্যাপারটি যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে এই খবর প্রচারিত হয়, সবার চোখে সেটা বিশেষভাবে ধরা পড়ে। বেশির ভাগ মানুষ হয়তো ধরেই নিয়েছেন, সরকার পরিবর্তন হলে উপাচার্যের পরিবর্তন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

Visit betsport.cv for more information.

উপাচার্য নিয়োগও কেন আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে

নতুন উপাচার্য নিয়োগের নানা রকম কারণ থাকতে পারে। রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার তো থাকেই, এমনকি উপাচার্যদের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগেও তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীদের বিশেষ দাবি বা আন্দোলনের মুখেও উপাচার্যদের পদত্যাগ করতে দেখা যায়। দুঃখজনক হলো, খুব কম ক্ষেত্রেই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করে একজন উপাচার্য সসম্মানে বিদায় নিতে পারেন। এর বিপরীতও অবশ্য দেখা যায়; সরকারের ‘অতি আস্থাভাজন’ হওয়ার কারণে বছরের পর বছর একজন অধ্যাপক উপাচার্যের পদে থাকেন।

দলীয় রাজনীতির আজ্ঞাবহ শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবেও বিভিন্ন সময়ে উপাচার্য পদে নিয়োগ পেতে দেখা গেছে। এটি কেন করা হয়, সেটি ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ভালো বলতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্ষেত্র, যেখানে জ্ঞানচর্চাই প্রধান লক্ষ্য, সেখানে ‘দলীয়’ উপাচার্য কেন প্রয়োজন হয়, এটি বোঝার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির দিকটি বোঝা দরকার।

বাচ্চাদের ভর্তিতে পরীক্ষা, উপাচার্য ‘ভর্তিতে’ নেই!

প্রায় প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি রয়েছে। শিক্ষকদের এই রাজনীতি যদি জাতীয় রাজনীতির ইতিবাচক লক্ষ্য ও গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখত, তবে আপত্তি ছিল না। শিক্ষক সমাজের এই অধিকার নিশ্চয় আছে—দেশের রাজনীতির ভালো-মন্দ দিক বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনে নতুন দিশা দেখানো। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ফোরামগুলো সরাসরি দলীয় রাজনীতির কণ্ঠ হয়ে কাজ করে। প্রায় সময়ই দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে এসব ফোরাম ব্যস্ত থাকে। তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি-কর্মসূচি সেই সাক্ষ্য বহন করে।

আবার ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রেও দলীয় রাজনীতির প্রভাব দেখা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কখনো লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতিকে অগ্রাহ্য করেনি, বরং প্রায় ক্ষেত্রেই তাকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এমনকি সেই ছাত্ররাজনীতি বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হলেও ক্ষমতাসীন দল তাকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে গেছে। ধারণা করা যেতেই পারে, ক্যাম্পাসগুলোতে দলীয় ছাত্ররাজনীতি জিইয়ে রাখার জন্য দলের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের উপাচার্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো হয়।

উপাচার্য বদলের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার। যাঁরা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তাঁদের যেন একাডেমিক এক্সেলেন্সি বা শ্রেষ্ঠত্ব থাকে। দায়িত্বরত কোনো উপাচার্যকে বিশেষ কারণ ছাড়া মেয়াদ শেষ করার আগে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা ঠিক নয়। কারণ, একজন ব্যক্তি যথেষ্ট যোগ্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই উপাচার্যের পদে নিযুক্ত হন।

খুব বেশি দিন আগের ব্যাপার নয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অতি মর্যাদাযুক্ত ও গৌরবজনক পদ ছিল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং উপাচার্যদের অনিয়মের খবর সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় সেই গৌরব ও মর্যাদা অনেকখানি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর্থিক কেলেঙ্কারি তো আছেই, এমনকি শিক্ষক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়ই স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সংবাদ পাওয়া যায়।

তবে সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য একতরফাভাবে উপাচার্যদের দোষ দেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের ক্রীড়নক হতে হয়। ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপকভাবে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবের কথা শোনা যায়। বিভিন্ন তদবির ও সুপারিশের মুখে উপাচার্যরা প্রায়ই অসহায় হয়ে থাকেন; তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে বাধ্য করা হয় কিংবা চাপ প্রয়োগ করা হয়।

উপাচার্য নিয়োগ ও জবাবদিহির জন্য কয়েকটি প্রস্তাব

নতুন কিংবা প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এ ধরনের সমস্যা আরও প্রকট। সেখানে একসঙ্গে অনেক পদে নিয়োগের দরকার হয়। এসব নিয়োগে বিভিন্ন পক্ষের নানামুখী চাপ থাকে। তা ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত নির্মাণ ও প্রকল্পভিত্তিক কাজেও সমস্যা হয়। নির্দিষ্ট পক্ষকে কাজ দেওয়ার জন্য প্রায় ক্ষেত্রেই ওপর মহল থেকে বাধ্যবাধকতা থাকে। উপাচার্যরা যদি ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে পারতেন, কিংবা দলনিরপেক্ষ ভূমিকায় নিয়োগ পেতেন, তবে এ ধরনের সমস্যার বিপরীতে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারতেন।

উপাচার্য বদলের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা দরকার। যাঁরা নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, তাঁদের যেন একাডেমিক এক্সেলেন্সি বা শ্রেষ্ঠত্ব থাকে। দায়িত্বরত কোনো উপাচার্যকে বিশেষ কারণ ছাড়া মেয়াদ শেষ করার আগে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা ঠিক নয়। কারণ, একজন ব্যক্তি যথেষ্ট যোগ্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতেই উপাচার্যের পদে নিযুক্ত হন। আর নতুন উপাচার্য নিয়োগ করার আগে আগ্রহী শিক্ষকদের কাছ থেকে অনলাইনে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন চাওয়া যেতে পারে। এভাবে প্রাথমিক তালিকা থেকে তিনজনের একটি প্যানেল তৈরি করে মন্ত্রণালয় আচার্যের সামনে হাজির করতে পারে।

আরেকটি ব্যাপার, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই একজন উপাচার্যকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া ঠিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি জ্যেষ্ঠ সমন্বয় কমিটি থাকতে পারে। উপাচার্য, দুজন সহ–উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রক্টরসহ ন্যূনতম পাঁচজনকে নিয়ে এই কমিটি হতে পারে। বড় বড় সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নেওয়া সম্ভব হলে উপাচার্যরা চাইলেই স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারবেন না; ভেতরের-বাইরের চাপও তাঁরা একত্রে সামাল দিতে পারবেন। 

  • তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read at source