বিজ্ঞানীদের চোখে প্রজেক্ট হেইল মেরি কতটা নিখুঁত সাই-ফাই
· Prothom Alo

সাই-ফাই মুভি দেখতে কমবেশি সবারই ভালো লাগে। কিন্তু মুভির বিজ্ঞান কি সব সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে? এই প্রশ্নটিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে হলিউডের নতুন ব্লকবাস্টার মুভি প্রজেক্ট হেইল মেরি নিয়ে।
Visit catcross.biz for more information.
এই মুভিতে এক অনিচ্ছুক নভোচারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রায়ান গসলিং। তাঁর চরিত্রের নাম রাইল্যান্ড গ্রেস। মানবজাতিকে বাঁচানোর এক মরিয়া মিশনে মহাকাশে পাড়ি জমান তিনি। এই যাত্রায় চরম বিপদের পাশাপাশি আছে অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে দারুণ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
প্রজেক্ট হেইল মেরি মুভিটি তৈরি হয়েছে অ্যান্ডি উইয়ারের লেখা দ্য মার্শিয়ান উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করেমুভিটি তৈরি হয়েছে অ্যান্ডি উইয়ারের লেখা একটি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে। অ্যান্ডি উইয়ার দ্য মার্শিয়ান-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় বই লিখেছেন। তিনি মূলত হার্ড সায়েন্স ফিকশন লেখেন। এই ঘরানার গল্পে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি খুব গুরুত্ব পায়। কল্পনার সঙ্গে বাস্তব তথ্যের নিখুঁত মিশ্রণ ঘটানোই তাঁর লেখার মূল আকর্ষণ। তাই এই মুভির বিজ্ঞান নিয়ে এত আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রজেক্ট হেইল মেরি: এক মহাজাগতিক দানবের আগমনপ্রজেক্ট হেইল মেরি মুভিটি তৈরি হয়েছে অ্যান্ডি উইয়ারের লেখা দ্য মার্শিয়ান উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে। তিনি মূলত হার্ড সায়েন্স ফিকশন লেখেন। এই ঘরানার গল্পে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি খুব গুরুত্ব পায়।
কী নিয়ে এত বিতর্ক
মুভির মূল গল্পে দেখা যায়, অ্যাস্ট্রোফেজ নামে মহাকাশের একধরনের অদ্ভুত জীবাণু আমাদের সৌরজগতে ঢুকে পড়েছে। এটি সূর্যের আলো শুষে নিচ্ছে। ফলে পৃথিবী ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর বরফযুগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই জীবাণু মহাকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের আলোও শুষে নিচ্ছে।
কিন্তু সূর্যের আলো কি সত্যিই কোনো জীবাণু শুষে নিতে পারে? বিজ্ঞানীরা এই ধারণাটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিলিয়ান বেলোভারি এটি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘সূর্যের আলো এভাবে শুষে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ধারণাটি শুনতে হয়তো বেশ কিউট। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক মার্ক পপিনচকও একই কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ‘সূর্য বা অন্য নক্ষত্রগুলো কল্পনাতীত রকমের বড়। সেগুলোর আলো শুষে নিতে অবিশ্বাস্য পরিমাণ জীবাণুর প্রয়োজন হবে।’
মুভিতে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক অসংগতি আছে। জেনন একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস। মুভিতে একে একটি নমনীয় কঠিন পদার্থে পরিণত হতে দেখা যায়। মহাকাশের বায়ুশূন্য অবস্থায় জীবাণুর বেঁচে থাকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এমনকি এই জীবাণু ব্যবহার করে নভোযান চালানোর ধারণাকেও বিজ্ঞানীরা বেশ অদ্ভুত বলে মনে করছেন।
প্রযুক্তির যুগে একাকীত্বের নতুন মানচিত্রআমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষক মার্ক পপিনচকের মতে, ‘সূর্য বা অন্য নক্ষত্রগুলো কল্পনাতীত রকমের বড়। সেগুলোর আলো শুষে নিতে অবিশ্বাস্য পরিমাণ জীবাণুর প্রয়োজন হবে।’
বিজ্ঞানীরা তবুও কেন মুগ্ধ
এত সব ভুল থাকার পরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু মুভিটি বেশ পছন্দ করেছেন। কেন? কারণ মুভিটি বিজ্ঞানের অন্যান্য অনেক দিক খুব নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।
যেমন, মহাকাশে শব্দের অনুপস্থিতি বা নীরবতা। কিংবা ঘূর্ণনের মাধ্যমে কৃত্রিম অভিকর্ষ তৈরির পদার্থবিজ্ঞান। মুভিতে গ্রহের নাম রাখা নিয়ে একটি দারুণ মজার দৃশ্য আছে। নভোচারী গ্রেসের সঙ্গে রকি নামের এক ভিনগ্রহী প্রাণীর বন্ধুত্ব হয়। রকি একটি গ্রহের নাম টাউ সেটি ই শুনে বেশ অবাক হয়।
মার্ক পপিনচক হাসতে হাসতে বলেন, ‘এটা একদম সত্যি কথা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আসলেই গ্রহ-নক্ষত্রের সুন্দর নাম রাখতে পারেন না!’
নভোচারী গ্রেস ও তাঁর ভিনগ্রহী প্রাণী বন্ধু রকিমুভির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো এর বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার ধরন। এখানে শুধু বিশাল বিস্ফোরণ বা ধ্বংসযজ্ঞ নেই; এখানে আছে চিন্তার আসল রোমাঞ্চ। গ্রেস এবং রকি হোয়াইটবোর্ড এবং যন্ত্রপাতি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে। তারা একটা আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। এই পথে তারা অনেক ভুল করে। কিন্তু সেই ভুলগুলো থেকে তারা নতুন কিছু শেখে। একে অপরের কাছ থেকেও শেখে অনেক কিছু।
জিলিয়ান বেলোভারি বলেন, ‘বিজ্ঞানের জগতে ভুল করা খুব জরুরি। যাঁরা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন না, তাঁরা এই বিষয়টি সব সময় বোঝেন না।’
চারদেয়ালের বন্দিদশায় এক অদ্ভুত থ্রিলার রহস্যমার্ক পপিনচক হাসতে হাসতে বলেন, ‘এটা একদম সত্যি কথা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আসলেই গ্রহ-নক্ষত্রের সুন্দর নাম রাখতে পারেন না!’
মুভিটি একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করার গুরুত্ব দারুণভাবে বুঝিয়েছে। গ্রেসের অতীত খুব একটা সুখকর ছিল না। নিজের গবেষণাপত্র নিয়ে হাসাহাসি হওয়ার পর তিনি একাডেমিয়ার জগৎ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো অন্যদের সঙ্গে খুব একটা মানিয়ে নিতে পারতেন না। কিন্তু রকির মতো একজন ভিনগ্রহী প্রাণীর মধ্যে তিনি একজন সত্যিকারের সহকর্মী খুঁজে পান।
অধ্যাপক শার্লট ওলসেন বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের মূল কাজগুলোর একটি হলো একসঙ্গে কাজ করা। আমার মনে হয়, গ্রেস এই মুভিতে একজন আসল বিজ্ঞানী হয়ে ওঠে। কারণ সে অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে শেখে।’
মিশনে যাওয়ার আগে গ্রেস একটি স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক কি সরাসরি মহাকাশযান চালাতে পারেন? মুভিটি হয়তো এই প্রশ্নটা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে। তবে একজন হাইস্কুল শিক্ষিকার মতে, ছাত্রছাত্রীরা এই মুভি থেকে দারুণ কিছু শিখতে পারে।
মিশনে যাওয়ার আগে গ্রেস একটি স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেনবিজ্ঞানীরাও যে মানুষ, তাঁদেরও যে আবেগ আছে এবং তাঁরাও ভুল করেন, এই মুভি সেটাই দেখায়। এখানে হয়তো পদার্থবিজ্ঞান বা অণুজীববিজ্ঞানের নিখুঁত ক্লাস হবে না; কিন্তু জীবনের জন্য এবং বিজ্ঞানের সত্যিকারের সৌন্দর্য বোঝার জন্য এটি একটি দারুণ শিক্ষা!
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসস্বপ্নের গোলকধাঁধায় মস্তিষ্কের খেলা