বরকতপূর্ণ সুন্নত সাহ্রির ফজিলত
· Prothom Alo
সাহ্রি শব্দের অর্থ শেষরাতের খাবার। রোজা ও রমজানের অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সাহ্রি। পরিভাষার দিক থেকে রোজা বা সাওম পালনের উদ্দেশ্যে ভোররাতে সুবহে সাদিকের আগে যে আহার গ্রহণ করা হয়, সেটিই সাহ্রি।
পূর্ববর্তী নবী–রাসুলের যুগে সাহ্রির বিধান ছিল না। তখন সন্ধ্যারাতে এশার ওয়াক্তের মধ্যে ঘুমানোর আগেই পানাহার শেষ করার নিয়ম ছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও ওই নিয়ম বিদ্যমান ছিল।
Visit zeppelin.cool for more information.
একবার হজরত কয়েস ইবনে সামরাহ আনসারি (রা.) নামের একজন সাহাবি সারা দিন পরিশ্রমের পর ইফতার করে রাতের খাবারের আগেই ঘুমিয়ে পড়েন এবং পরদিন রোজা রেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ বিষয়টি প্রিয় নবীজি (সা.)–এর কাছে পেশ করা হলে সাহ্রির নতুন বিধান–সংবলিত এই আয়াত নাজিল হয়, ‘সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী মিলন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদস্বরূপ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদস্বরূপ। আল্লাহ জানেন যে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হলেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন। সুতরাং এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সংগত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন, তা কামনা করো। আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ণ রেখা থেকে উষার শুভ্র রেখা সুস্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত আসা পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৭)
তাকওয়া অর্জন এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য সাহ্রির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহ্রি খাও। কেননা, সাহ্রিতে রয়েছে বরকত।’ (বুখারি, ১৮০১)
নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘আমাদের রোজা আর আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহ্রি খাওয়া আর না খাওয়া।’ (মুসলিম, আলফিয়াতুল হাদিস, পৃষ্ঠা: ১৩১)
‘অর্ধরাত্রির পর থেকে সাহ্রির সময় শুরু হয়।’ (মোল্লা আলী কারী (রহ.) মিরকাত শরহে মিশকাত)। ইমাম যামাখ্শারী (রহ.) ও ফকিহ আবুল লাঈস ছামারকান্দী (রহ.)–এর মতে, সাহ্রির সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।
সাহ্রি একটি ইবাদত, এই ইবাদতকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা এমন কোনো প্রথায় পরিণত করা যাবে না, যাতে এর ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, ইবাদতের ভাবগাম্ভীর্য বিনষ্ট হয় এবং শরিয়তের বিধান লঙ্ঘিত হয় অথবা কোনো গুনাহের কারণ হয়
সাহ্রি বিলম্বে খাওয়া সুন্নত। তবে সন্দেহের সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত নয়, তার আগেই সাহ্রির নিরাপদ সময়সীমার মধ্যে পানাহার শেষ করতে হবে। রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সাহ্রি খাও; যদি তা একঢোঁক পানিও হয়’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তোমরা সাহ্রি খাও; যদি এক লোকমা খাদ্যও হয়’। (মুসলিম) অর্থাৎ যেকোনো প্রকার ও যেকোনো পরিমাণ খাদ্য বা পানীয় দ্বারাই সাহ্রির সুন্নত পালন হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে সাহ্রি গ্রহণ না করলে সুন্নত তরক হবে।
কখনো যদি ফরজ গোসল করে সাহ্রি খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না থাকে; তখন অজু করে বা হাত–মুখ ধুয়ে আগে সাহ্রি খেয়ে নিতে হবে। তারপর গোসল করে ফজরের নামাজ আদায় করতে হবে। গোসল ফরজ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গোসল করে নিতে হবে, বিনা ওজরে বেশি সময় অপবিত্র অবস্থায় থাকা সমীচীন নয়; আর রোজা অবস্থায় অধিকক্ষণ অপবিত্র থাকা মোটেও উচিত নয়, এটি মাকরুহ। সাহ্রি খাওয়া সম্ভব না হলেও রমজানের ফরজ রোজা রাখতে হবে।
নিজেরা সাহ্রি খাওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অভাবী অসহায় মানুষদের সাহ্রিতে সহযোগিতা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পেট পুরে পানাহার করে পরিতৃপ্ত হলো, তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটাল, সে মুমিন নয়।’ (তিরমিজি)
সাহ্রি একটি ইবাদত, এই ইবাদতকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা এমন কোনো প্রথায় পরিণত করা যাবে না, যাতে এর ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, ইবাদতের ভাবগাম্ভীর্য বিনষ্ট হয় এবং শরিয়তের বিধান লঙ্ঘিত হয় অথবা কোনো গুনাহের কারণ হয়।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম