বাবারা এমনই হয়

· Prothom Alo

সম্প্রতি একটি ছবি ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে; ছুঁয়ে যায় অসংখ্য মানুষের হৃদয়। ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব ওউরো প্রেতোর (ইউএফওপি) প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতক লরেঞ্জো মনফারদিনি কাঁধে একটি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে তাঁর সমাবর্তনের মঞ্চে ওঠেন। প্রথম দেখায় নিঃসন্দেহে এটি ছিল একটি অভিনব ও অভূতপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু এর পেছনের গল্পটি ছিল অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী।

লরেঞ্জো বলেন, ‘এই সিলিন্ডারটা আমার বাবার। তিনি ২৬ বছর ধরে বাড়ি বাড়ি গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন। রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন, কাঁধে ১৪ কেজির সিলিন্ডার নিয়ে সিঁড়ি ভেঙেছেন, যাতে আমি লেখাপড়া করতে পারি, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারি। আজ আমার গ্র্যাজুয়েশনের দিন। ডিগ্রিটা আমার একার না, আমার বাবাও এর সমান দাবিদার।’

Visit turconews.click for more information.

বাবা দিবসের বিশেষ লেখা

আমাদের চারপাশে এমন হাজারো ‘লরেঞ্জো’ আর তাঁদের লড়াকু বাবাদের গল্প ছড়িয়ে আছে। চা–বিক্রেতা বাবা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন; রিকশাচালক বাবার প্যাডেলের প্রতিটি ঘূর্ণনে লালিত হয় এক অদম্য বিশ্বাস—সন্তান একদিন আকাশ ছুঁবে। গ্রামের সেই বাবা, যিনি নিজের শেষ সম্বল একটুকরা জমি বিক্রি করে সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদূর শ্রেণিকক্ষে জায়গা করে দেন। তাঁদের চোখে ক্লান্তি নেই, অভিযোগ নেই, শুধু আছে এক নির্মোহ স্বপ্ন: ‘সন্তানের সাফল্য আর উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ।’

নোয়াখালীর আবদুল মালেকের মেয়ে সুমাইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন। ভর্তি ফি ১৪ হাজার টাকা। মালেকের যা আয়, তা দিয়ে পরিবারের সবার দুবেলা খাবার জোগানোই ভীষণ কষ্টসাধ্য। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। তিন মাস টানা সকাল থেকে গভীর রাত অবধি রিকশা চালিয়েছেন। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ—কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেননি। ভর্তির দিন মেয়েকে নিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে তিনি একটা কথাই বলেছিলেন, ‘মা, তুই শুধু পড়। রিকশার প্যাডেল আমি মারব। তোর পড়া যেন থেমে না যায়।’ সুমাইয়া আজ বিসিএস ক্যাডার। বাবা মাথা উঁচু করে বলেন, “মেয়ে আমার অফিসার।”

বাবার বুকে সন্তান

সিলেটের মৌলভীবাজারের চা–বাগানে কাজ করতেন রমজান আলী। দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা। তাঁর ছেলে জাহিদ মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে খরচ প্রায় ৮ হাজার টাকা। রমজান আলী বাগানের পাশে জমিতে রাতে শাকসবজি চাষ শুরু করলেন। স্ত্রীকে নিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। একদিন জাহিদ বলেছিলেন, ‘বাবা, তুমি এত কষ্ট কোরো না।’ বাবা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কষ্ট তো আমার জন্য না রে, বাবা। তুই ডাক্তার হলে গরিব মানুষের সেবা করবি। ওইটাই আমার বিশ্রাম।’

জাহিদ বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছেন, তিনি আজ চিকিৎসক। বিনা পয়সায় বাগানের শ্রমিকদের চিকিৎসা দেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্টেথোস্কোপের নিচে বাবার ঘামের গন্ধ পাই।’

যশোরের শহিদুল ইসলাম দরজির কাজ করেন। তাঁর ছেলে রাব্বি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হন। ছেলের পড়াশোনার জন্য একটা ল্যাপটপের ভীষণ প্রয়োজন। শহিদুলের টেইলারিং দোকান থেকে মাসিক আয় সর্বসাকুল্য ১২ হাজার টাকা। তিনি ৬ মাস ধরে দিনে ১৬ ঘণ্টা সেলাই মেশিন চালিয়েছেন। ঈদের সময় নতুন পাঞ্জাবি সেলাই করে দোকানের সামনে ঝুলিয়ে রাখতেন, নিজে পুরোনো পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে থাকতেন। ছেলে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘আমার কাপড় লাগবে না। তোর ল্যাপটপ হলেই আমার ঈদ।’ রাব্বি এখন ইঞ্জিনিয়ার, গুগলে কাজ করেন।

সুখের অন্বেষণে অন্তহীন যাত্রা

ইতিহাসের পাতায় আমরা আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, এ পি জে আবদুল কালাম, লিওনেল মেসি কিংবা শচীন টেন্ডুলকারের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাফল্যগাথা পড়ি। কিন্তু তাঁদের জীবনের গভীরে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি নক্ষত্রের পেছনে ছিলেন একজন নীরব মানুষ, একজন বাবা। তিনি হয়তো রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, বিশ্বকাপ জেতেননি, কোনো আবিষ্কারের পেটেন্টও তাঁর নামে ছিল না। কিন্তু তাঁর ত্যাগ, শিক্ষা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছাড়া হয়তো ইতিহাসের সেই নায়কদের জন্মই হতো না। তাই প্রতিটি মহান সন্তানের সাফল্যের গল্পে, অদৃশ্য কালিতে লেখা থাকে আরেকজন শিক্ষকের নাম—‘বাবা’। প্রখ্যাত গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের মতে, একজন বাবা এক শজন শিক্ষকের সমান।

বাবাদের আবেগ, ভালোবাসা হয়তো সব সময় দৃশ্যমান নয়। তাঁরা চোখের জল লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু সন্তানের চোখে জল দেখলে ভেতরে–ভেতরে ভেঙে পড়েন। তাঁরা ক্লান্ত হন, অসুস্থ হন, হতাশ হন—তবু পরিবারের সামনে শক্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। বাবারা যা দেন, তার হিসাব হয় না। বাবারা সন্তানকে ছায়া দেন, রোদটা নিজে নেন। মার্কিন আধ্যাত্মিক গুরু বিলি গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘একজন ভালো বাবা আমাদের সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, অপ্রশংসিত, অথচ সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর অন্যতম।’

কনা, চারটি প্রাণ আর এক সমুদ্র ভালোবাসা

সব ধর্মেই বাবাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘পিতার ঋণ শোধ করা যায় না, শুধু বহন করা যায়।’ সত্যিই তা–ই। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বাবাদের আজীবন ত্যাগ ও অবদান। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব বাবা। পবিত্র কোরআনের সেই হৃদয়ছোঁয়া দোয়াটি তাই বারবার মনে আসে: ‘হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। হয়তো এটাই পিতাকে উৎসর্গ করা সবচেয়ে গভীর ও অর্থবহ বার্তাগুলোর একটি।

*লেখক: সাজ্জাদুল হাসান, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns.prothomalo.com

Read at source