আজীবন সম্মাননা পেয়ে আবেগে আপ্লুত হলেন হরিপদ পাল
· Prothom Alo

জীবনের শেষ বেলায় এসে আজীবন সম্মাননা পেয়ে অভিভূত হলেন পুরান ঢাকার প্রবীণ প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল। শনিবার বিকেলে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ তাঁকে ‘ক্রাফটস ভিলেজেস আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করে।
পুরস্কার গ্রহণ করে আবেগাপ্লুত প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল আয়োজকদের প্রতি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আপনারা কৃপা করে আজ আমাকে যে সম্মানিত করলেন, তাতে আমি খুবই আনন্দিত। এখন বলতে গেলে আমার কেউ নাই। এক ছেলে এক মেয়ে ছিল। তারা আমার আগেই পৃথিবী থেকে চলে গেছে। স্ত্রীও রোগে শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় সম্মান পেলাম। অর্থ–সম্মানের প্রতি আমার কোনো মোহ মায়া নাই। মনের আনন্দেই সারা জীবন কাজ করেছি। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন কাজ করে যেতে পারি। আপনারা আমার জন্য এই প্রার্থনাই করবেন।’ তাঁর কথায় এক আবেগময় পরিবেশ সৃষ্টি হয় অনুষ্ঠানে।
Visit newsbetting.bond for more information.
হরিপদ পালের জীবনী পাঠ ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্য শেখ সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, হরিপদ পালকে এখন দেশের কিংবদন্তিতুল্য প্রতিমাশিল্পী হিসেবে মনে করা হয়। ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার কুড়লিয়া গ্রামের এক প্রতিমাশিল্পী পরিবারে তাঁর জন্ম। দাদু ও বাবার কাছে শৈশবে প্রতিমা তৈরির শিক্ষা নেন।
হরিপদ পালের হাতে গড়া বিভিন্ন দেব–দেবীর প্রতিমা, বিশেষত দুর্গাপ্রতিমা বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে প্রসিদ্ধ। ২০ জুনপরে দীর্ঘ সময় কলকাতার বিখ্যাত কুমারটুলীতে থেকে হাতে–কলমে প্রতিমা ও ভাস্কর্য নির্মাণের শিক্ষা নিয়েছেন। মাটির বৈশিষ্ট্য, প্রতিমার গড়ন, অঙ্গসৌষ্ঠব, মুখের সৌন্দর্য সৃষ্টিতে বিশিষ্টতা অর্জন করেন তিনি। স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে নিজের কর্মশালা গড়ে তোলেন। তাঁর হাতে গড়া বিভিন্ন দেব–দেবীর প্রতিমা, বিশেষত দুর্গাপ্রতিমা বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে প্রসিদ্ধ। দেব–দেবীর প্রতিমা ছাড়াও বিভিন্ন ভাস্কর্য তৈরি করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন মন্দিরসহ জাদুঘরে তাঁর তৈরি প্রতিমা ও ভাস্কর্য রয়েছে। নির্লোভ, বিনয়ী, নিভৃতচারী এই শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন খুবই বেদনাময়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছেন করোনায় আর মেয়ে চলে গেছে জটিল রোগে। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী স্ত্রীর পরিচর্যা করে চলেছেন তিনি। অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক ও এক লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়।
এ অনুষ্ঠানে মিলনায়তনের সামনে হরিপদ পালের তৈরি বেশ কিছু প্রতিমা, ভাস্কর্য ও নির্মাণসামগ্রী প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল।
জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন এলাকার কারুশিল্পী ও পরিষদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত গবেষক ও উদ্যোক্তারা অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ফারহানা শারমিন।
পুরস্কার গ্রহণ করে আবেগাপ্লুত প্রতিমাশিল্পী হরিপদ পাল আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ২০ জুন‘বাংলাদেশের প্রতিমাশিল্পী ও শিল্পীসমাজ’ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক উদয় শংকর বিশ্বাস। বিশেষ অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক বজলুর রশিদ খান ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী।
আলোচনায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসুদ ইমরান, কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাফটস ভিলেজেস লিমিটেড’–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুণ কুমার পাল, ২০১৬ সালের আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী বিশ্বেশ্বর পাল, কারুশিল্প পরিষদের সহসভাপতি শাহীদ হোসেন, বরিশাল অঞ্চলের কারুশিল্পের পৃষ্ঠপোষক ও সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ প্রমুখ।
আলোচকেরা দেশের কারুশিল্পীদের বিভিন্ন সমস্যা, বিদেশে কারুপণ্যের বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা ও সমস্যা, দেশের ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্যের আইনি সুরক্ষার জন্য সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা কারুশিল্প পরিষদকে আরও শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলারও পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশিষ্ট শিল্পী কামরুল হাসানের উদ্যোগে দেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পীদের প্রচার–প্রসার ও কারুশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতে ১৯৮৫ সাল থেকে জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট কারুশিল্পীদের আজীবন সম্মাননা দেওয়া শুরু হয়।