রুটি–চাটনি খেয়ে আড়াই টাকায় দিন কাটত, সেই অভিনেতা এখন...
· Prothom Alo

ভারতীয় সিনেমায় এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁদের উপস্থিতি পর্দায় মানেই বাস্তব জীবনের ছোঁয়া। তাঁরা অভিনয় করেন না; বরং চরিত্র হয়ে ওঠেন। রঘুবীর যাদব সেই বিরল অভিনেতাদের একজন। তাঁর অভিনয়ে নেই তারকাসুলভ চাকচিক্য, নেই অতিরঞ্জন। আছে সাধারণ মানুষের জীবন, হাসি, কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। আজকের প্রজন্ম তাঁকে সবচেয়ে বেশি চেনে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’-এর প্রধানে ‘ব্রিজভূষণ দুব’–এর চরিত্রে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের পথচলা। যেখানে ছিল অভাব, ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও অবিরাম শেখার তাগিদ।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রঘুবীর যাদব স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, জীবনের এক সময় তিনি মাত্র আড়াই টাকা দৈনিক আয় করতেন। সেই টাকায় আটা কিনে রুটি আর টমেটোর চাটনি খেয়ে দিন কাটাতে হতো। কখনো কখনো সেই খাবারও চুরি হয়ে যেত। কিন্তু তিনি সেই সময়কে ‘সংগ্রাম’ বলতে রাজি নন।
মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট গ্রাম থেকে যাত্রা
১৯৫৭ সালের ২৫ জুন মধ্যপ্রদেশের জবলপুরের কাছে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম রঘুবীর যাদবের। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই গান, লোকনাট্য ও অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ ছিল। তবে পরিবারের প্রত্যাশা ছিল অন্য রকম। সাধারণ ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তাঁর কাছ থেকেও স্থায়ী চাকরি এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের আশা করা হয়েছিল। সে কারণেই তাঁকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পাঠানো হয়।
Visit moryak.biz for more information.
কিন্তু বিজ্ঞানের সূত্র, রসায়নের সমীকরণ বা পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব রঘুবীরের মন টানতে পারেনি; বরং মঞ্চ, গান ও অভিনয়ই ছিল তাঁর সত্যিকারের ভালোবাসা।
যে ‘ব্যর্থতা’ জীবন বদলে দিল
রঘুবীর যাদব পরে বহুবার বলেছেন, জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল বিজ্ঞান বিভাগে অকৃতকার্য হওয়া। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পরীক্ষায় পাস করতে পারবেন না। তাই ফল প্রকাশের আগেই এক বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। অনেকের কাছে এটি ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
বাড়ি ছেড়ে ঘুরতে ঘুরতে রঘুবীর যাদব পৌঁছান উত্তর প্রদেশের ললিতপুরে। সেখানে একটি নাট্যদল কাজ করছিল। সেই নাট্যদলের নেতৃত্বে ছিলেন অভিনেতা অনু কাপুরের বাবা মদনলাল কাপুর। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত শিল্পীজীবন।
আড়াই টাকার চাকরি
নাট্যদলে যোগ দেওয়ার পর রঘুবীর যাদবের দৈনিক পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়েছিল মাত্র ২ টাকা ৫০ পয়সা।
আজকের দিনে এই অঙ্ক কল্পনাও করা কঠিন। কিন্তু সেই সময়ও এটি খুবই সামান্য অর্থ ছিল।
রঘুবীর স্মরণ করেছেন, প্রায়ই পুরো পারিশ্রমিকও মিলত না। যা পাওয়া যেত, তা দিয়ে আটা ও টমেটো কেনা হতো। তারপর রুটি বানিয়ে চাটনির সঙ্গে খেয়ে দিন কাটত। কখনো এমনও হয়েছে, রাতের জন্য রাখা খাবার কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। তখন না খেয়েই থাকতে হয়েছে।
কিন্তু রঘুবীর আজও সেই স্মৃতিকে দুঃখের চোখে দেখেন না; বরং বলেন, সেই সময়ই তাঁকে জীবন চিনতে শিখিয়েছে।
‘সংগ্রাম’ শব্দটি পছন্দ নয়
বলিউডে প্রায়ই শিল্পীদের ‘সংগ্রামের গল্প’ শোনা যায়। কিন্তু রঘুবীর যাদবের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই আলাদা। তাঁর মতে, শেখার প্রক্রিয়াকে সংগ্রাম বলা ঠিক নয়। তিনি মনে করেন, একজন সংগীতশিল্পী যেমন নিয়মিত রেওয়াজ করেন, নৃত্যশিল্পী যেমন প্রতিদিন অনুশীলন করেন, তেমনি অভিনেতাকেও সারা জীবন শিখতে হয়। তাঁর ভাষায়, জীবন আসলে একটি স্কুল। এখানে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি ভাষা ও সংগীত শিক্ষা
নাট্যদলে কাজ করার সময় শুধু অভিনয়ই শেখেননি রঘুবীর। তিনি উর্দু ভাষা শিখেছেন, উচ্চারণ শুদ্ধ করেছেন, সংগীতের চর্চা করেছেন ও লোকসংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করেছেন। পরে তাঁর অভিনয়ে যে স্বাভাবিকতা দেখা যায়, তার পেছনে এই দীর্ঘ প্রস্তুতির বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, অভিনেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও শেখার আগ্রহ।
২০ বছর বাড়ি থেকে দূরে
বাড়ি ছেড়ে বের হওয়ার পর একসময় রঘুবীর যাদব বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তিনি এমন কিছু করবেন না, যাতে পরিবারের অসম্মান হয়। ছয় মাস পর একবার বাড়িতে ফিরেছিলেনও। কিন্তু এক আত্মীয় মজা করে বলেছিলেন, তাঁরা ভেবেছিলেন তাঁকে এবার শুধু সিনেমার পর্দাতেই দেখা যাবে। সেই কথা শুনে এতটাই অস্বস্তি হয়েছিল যে সেদিন রাতেই আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর প্রায় ২০ বছর নিজের গ্রামে ফিরে যাননি। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
জাতীয় নাট্য বিদ্যালয়ের দিনগুলো
থিয়েটারে কাজ করতে করতেই রঘুবীর দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে তিনি পেশাদার অভিনয়ের আরও ভালোভাবে শেখার সুযোগ পান। নাট্যজগতের বহু কিংবদন্তির সংস্পর্শে আসেন। মঞ্চে কাজ করতে করতে অভিনয়ের সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর অভিনয়ের যে গভীরতা দেখা যায়, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই সময়েই।
‘সালাম বম্বে!’—জীবন বদলে দেওয়া সিনেমা
১৯৮৮ সালে পরিচালক মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’-তে অভিনয়ের সুযোগ পান রঘুবীর যাদব।
সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল প্রশংসা পায় এবং অস্কারের জন্যও মনোনীত হয়। এই ছবিতে রঘুবীরের অভিনয় সমালোচকদের নজর কাড়ে। হঠাৎই ভারতীয় অভিনয়জগৎ বুঝতে পারে, এক অসাধারণ প্রতিভার আগমন ঘটেছে।
মুঙ্গেরিলাল হয়ে ঘরে ঘরে পরিচিতি
১৯৮৯ সালে দূরদর্শনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘মুঙ্গেরিলাল কে হাসিন সপনে’ রঘুবীরকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। স্বপ্নবিলাসী সাধারণ মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেয়। আজও বহু মানুষ তাঁকে ‘মুঙ্গেরিলাল’ নামেই স্মরণ করেন।
চরিত্রাভিনেতা হিসেবে পরিচিতি
বলিউডে নায়ক হওয়ার দৌড়ে রঘুবীর যাদব কখনো নাম লেখাননি; বরং চরিত্রাভিনেতা হিসেবেই নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বাভাবিকতা। দর্শক কখনো মনে করেন না তিনি অভিনয় করছেন। মনে হয় যেন বাস্তব জীবনের একজন মানুষকে দেখছেন।
সংগীতশিল্পী হিসেবেও সফল
অনেকেই জানেন না, রঘুবীর একজন দক্ষ গায়কও। লোকসংগীত ও আঞ্চলিক সুরের ওপর তাঁর দখল অসাধারণ। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গানও গেয়েছেন তিনি। সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা শৈশব থেকেই। অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তিনি সমান নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।
‘পঞ্চায়েত’-এর নতুন জনপ্রিয়তা
ডিজিটাল যুগে এসে আবারও নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন রঘুবীর যাদব। ব্রিজভূষণ দুবের চরিত্রে তিনি যেন নতুন জীবন পান। গ্রামের সরল, রসিক ও রাজনৈতিকভাবে চতুর প্রধানের চরিত্রটি দর্শকদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে অনেকের কাছে এখন পঞ্চায়েত মানেই রঘুবীর যাদব। এই সিরিজ তাঁর অভিনয় প্রতিভাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে