তোফায়েল আহমেদ: অল্প কথায় স্বল্প স্মৃতি

· Prothom Alo

তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে অনেক স্মৃতি বা তিনি আমার অতি পরিচিত বললে ভীষণভাবে বাড়িয়ে বলা হবে। তাঁর নাম প্রথম শুনেছিলাম উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময়। তখন ডাকসুর ভিপি হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা।

Visit esporist.org for more information.

বলতে গেলে, শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানীর মতো জাঁদরেল নেতাদের চেয়ে তখন বোধ হয় বেশি পরিচিত ছিলেন আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ ও তোফায়েল আহমেদের মতো ডাকসাইটে ছাত্রনেতারা। তাঁদের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান দৌড়ে পালালেন, বঙ্গবন্ধু ও অন্যদের বিরুদ্ধে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলো পাকিস্তান সরকার। আমি তখন হাইস্কুলের শেষ দরজায়। সরকারি চাকুরে বাবার সরকারি স্কুলে পড়া নিরীহ ছাত্র।

অনেক বছর পর তোফায়েল আহমেদের গল্প শুনেছিলাম বাবার মুখে। ধানমন্ডিতে বাবার বাড়ি, চাকরিস্থল চট্টগ্রামে। ১৯৭২–এর শুরুতে পুরোনো ভাড়াটে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল আর লাগানো হলো ‘টু-লেট’। বাড়িটি আবাহনী মাঠের পশ্চিম দিকে ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে ৫–৭ মিনিটের হাঁটা পথ। তোফায়েল আহমেদ নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব। ‘টু-লেট সাহেব’, অর্থাৎ বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, বাড়িটি ভাড়া নেওয়ার জন্য। রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তোফায়েল আহমেদের বাড়িভাড়া বাবদ সরকারি বরাদ্দ ছিল মাসিক সাড়ে সাত শ টাকা। সেই টাকায়ই রফা হলো। আগের ভাড়াটে যে সাড়ে ছয় শ টাকা দিত, সেই কথাটি বাবা তোফায়েল আহমেদকে বলেছিলেন কি না, জানি না।

আজকের কেচ্ছা শুরু তারও তিন বছর পর। ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে বাবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বদলি হলেন। ওই নিয়ম এখন আছে কি না, জানি না। তবে তখন নিয়ম ছিল, সরকারি চাকুরে যে শহরে বদলি হবেন বা বাস করবেন, সেই শহরে তাঁর ১০ বছরের বেশি সময় ধরে নিজস্ব বাড়ি থাকলে সরকারি আবাসন–সুবিধা পেতেন না। তত দিনে বাবার ধানমন্ডির বাড়ির বয়স প্রায় ১৫ বছর হয়ে গেছে। সমস্যা হয়ে দাঁড়াল তোফায়েল আহমেদের মতো জাঁদরেল ভাড়াটেকে বাড়ি ছাড়ার কথা বলা।

দুরু দুরু বক্ষে ঢাকায় এসে কাঁচুমাচু করে বলেই ফেললেন। অর্থাৎ ঢাকায় বদলি হয়েছেন, তাই নিজ বাসায় থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অনেক পরে বাবার মুখে শুনেছিলাম, তোফায়েল আহমেদের একটাই প্রশ্ন ছিল, ‘কোন দিন বাড়ি ছাড়তে হবে?’ বাবার উত্তর, ‘এক মাসের মধ্যে ছাড়লে উপকার হয়।’ কোনো উচ্চবাচ্য না করে মাস পেরোনোর আগেই তিনি বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

পড়াশোনার জন্য আমি দেশ ছেড়েছিলাম ১৯৭৩ সালে। অর্থাৎ সেই সময়গুলোতে আমি দেশে ছিলাম না। বাড়ি কেচ্ছার দ্বিতীয় কিস্তি ঘটেছিল সম্ভবত ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকে। ১৯৭৫ সালের আগস্টের পালাবদলের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতোই তোফায়েল আহমেদও ছিলেন জেলে। নতুন শাসকেরা পুরোনো আমলের হোমরাচোমরাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলায় মালমসলা সংগ্রহে ভীষণ ব্যস্ত।

সম্ভবত তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে জুতসই মালমসলার হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। সামরিক গোয়েন্দারা বাবাকে তলব করল। ‘তোফায়েল আহমেদ তো আপনার বাড়ি দখল করেছিল?’ বাবার স্বাভাবিক উত্তর ছিল, ‘না, উনি আমার ভাড়াটে ছিলেন, যখন বাড়ি ছাড়তে বলেছি, তখনই ছেড়ে দিয়েছিলেন।’ ওই সামরিক জেরার তিন–চার দিন পর তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী নাকি বাবার বাসায় এসে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

উনসত্তরের তোফায়েল আহমেদ

দুই.

অন্তত বছর পনেরো বা তার বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সুশীল সমাজের দু-চারটা আলোচনা সভায় তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে দু-চারবার দেখা হয়েছিল। প্রথমবার তাঁর সঙ্গে মঞ্চে বসে বুঝতে পারছিলাম, উনি মঞ্চে উপবিষ্ট পাশের ব্যক্তিকে আমার ব্যাপারে ফিসফিস করে ‘এই লোকটা কে’ গোছের প্রশ্ন করেছিলেন। সভার শেষে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে একটা বেফাঁস কথা বলেই ফেললাম, ‘আমি অমুকের ছেলে।’ সঙ্গে সঙ্গেই বাবার ভালো–মন্দ জিজ্ঞেস করলেন। কয়েক মাস পর ওই গোছেরই আরেকটা আলোচনা সভায়—মঞ্চে না শ্রোতার সারিতে ছিলাম, সঠিক মনে পড়ছে না—তোফায়েল আহমেদ সামরিক গোয়েন্দাদের আমার বাবাকে তলব করার কথা জোর গলায় বর্ণনা করলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির কল্পিত মালমসলা অকাতরে সাপ্লাই না করার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করলেন।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর সংবাদের পর তাঁর জীবনীসংক্রান্ত কোনো বই আছে কি না, সে প্রশ্ন রেখেছিলাম গুগল চাচার কাছে। গুগল চাচা নিরুত্তর। প্রত্যেক মানুষের মতো রাজনীতিবিদদের জীবনে থাকে অনেক কিছু ভালো, তার সঙ্গে কিছু খারাপও। আমাদের জাতি গঠনে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, আমাদের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদের জীবনকাহিনির অত্যন্ত অভাব। অকাতরে তেল মালিশ করার জীবনী আছে ভূরি ভূরি, কিন্তু আমরা এখনো রাজনীতিবিদদের নির্মোহ জীবনী লিখতে শিখতে পারিনি।

  •  ড. শাহদীন মালিক সিনিয়র অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read at source