বিশ্বের সবচেয়ে অপরিচিত ব্র্যান্ড: চীনের বিওয়াইডি কীভাবে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে মাস্কের

· Prothom Alo

অটোমোবাইল শিল্পের গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এমন তোলপাড় আগে কখনো দেখেনি বিশ্ব। জার্মানি, জাপান ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন চীনা জায়ান্ট ‘বিওয়াইডি’র দাপটে ম্লান হয়ে পড়েছে। ইলন মাস্কের টেসলার রাজত্ব কেড়ে নেওয়া বিওয়াইডি শুধু যে গাড়ি নির্মাণ করেই ক্ষান্ত দিচ্ছে, তা নয়। তারা চিপ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতেও এক নতুন বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছে।

Visit truewildgame.com for more information.

সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আর তাৎক্ষণিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিওয়াইডি আজ বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মজার বিষয় হলো, টেসলাকে পেছনে ফেললেও প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিচিত ব্র্যান্ড’ পরিচয় দেয়। চীনা এই প্রতিষ্ঠানের অকল্পনীয় উত্থান এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের নেপথ্য কাহিনি নিয়েই এই বিশেষ আয়োজন।

বেইজিং অটো শোতে বিওয়াইডির নতুন ‘ডেনজা জেড৯ জিটি’ মডেলের ভিডিও করছেন আগত এক দর্শনার্থী

সিংহাসন হারাল টেসলা

বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য হারিয়েছে ইলন মাস্কের টেসলা। বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের বার্ষিক বিক্রির হিসাবে এই প্রথম মার্কিন এই প্রতিদ্বন্দ্বীকে টপকে বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের বিওয়াইডি। গত এক বছরে টেসলার বিক্রি ৯ শতাংশ কমে গেছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে যা ১৬ শতাংশে পৌঁছে যায়।

বিপরীতে বিওয়াইডি এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গত বছর তাদের ব্যাটারিচালিত গাড়ির বিক্রি গত বছরে ২৮ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। মূলত এই উল্লম্ফনই বিশ্ববাজারে টেসলার দীর্ঘদিনের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ফেলে দিয়েছে।

টেসলার এই পতনের পেছনে মার্কিন সরকারের সাড়ে ৭ হাজার ডলারের ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং মাস্কের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

পুরো লড়াইটি আসলে ‘সাশ্রয়ী মূল্য’ বনাম ‘আভিজাত্য’র মধ্যে। টেসলার একটি গাড়ির গড় বিক্রয়মূল্য যেখানে প্রায় ৪৫ হাজার ডলার, বিওয়াইডির সেখানে মাত্র ২২ হাজার ৪০০ ডলার।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিওয়াইডির মাত্র ১০ হাজার ডলারের (প্রায় ১২ লাখ টাকা) ‘সিগাল’ মডেলটি এখন বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে বড় এক আতঙ্কের নাম। টেসলা বা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বিওয়াইডির এই দামের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিওয়াইডি এখন শুধু চীনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপেও তারা বাজার দখলে নেমেছে। যুক্তরাজ্যে গত এক বছরে তাদের বিক্রি ৮৮০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে বিওয়াইডির ‘সিল ইউ’ মডেলের এসইউভি গাড়িটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

ধনকুবের ইলন মাস্ক টেসলার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ এবং ‘স্পেসএক্স’ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী এখন টেসলার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।

ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের চোখে টেসলার ভবিষ্যৎ এখন বেশ ধূসর। মার্কিন আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েলস ফার্গোর বিশ্লেষক কলিন ল্যাঙ্গান টেসলাকে বলছেন ‘প্রবৃদ্ধিহীন এক কোম্পানি’। তাঁর মতে, বারবার দাম কমিয়েও টেসলা এখন আর বিক্রি বৃদ্ধি করতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা বার্নস্টাইনের বিশ্লেষক টনি সাকোনাঘি মনে করেন, বিওয়াইডির মতো সস্তা চীনা ব্র্যান্ডের কাছে টেসলা ক্রমশ আকর্ষণ হারাচ্ছে। তাঁর মতে, টেসলা এখন স্রেফ একটি সাধারণ গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠান। রয়টার্স ও ব্লুমবার্গের তথ্য বলছে, গত চার বছরে এই প্রথম টেসলার বিক্রি কমেছে।

একটি বিষয় বলে রাখা ভালো, বিক্রি ও বাজার সম্প্রসারণে বিওয়াইডি এগিয়ে গেলেও প্রতি গাড়ি থেকে আয়ের দিক দিয়ে টেসলা এখনো শক্ত অবস্থানে আছে। নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার চাপে ইলন মাস্ক এখন রোবোট্যাক্সি ও হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তির ওপর বড় বাজি ধরছেন। তবে মাস্কের মনোযোগের অভাব আর বাজারের মন্দায় অনেক বিশ্লেষকের চোখে টেসলার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

চলতি বছরের শুরুতে আর্জেন্টিনার একটি বন্দরে বিওয়াইডির নিজস্ব কার্গো জাহাজ ‘বিওয়াইডি চাংঝু’ থেকে খালাস করা হচ্ছে নতুন ইলেকট্রিক গাড়ি। নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বাজার সম্প্রসারণ করছে চীনা এই প্রতিষ্ঠান

বিওয়াইডির মূল শক্তি কী

বিওয়াইডির অভাবনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের বিশেষ উৎপাদন কৌশল ‘ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন’ বা স্বনির্ভরতা। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জনপ্রিয় ‘সিল’ মডেলের যন্ত্রাংশের ৭৫ শতাংশই বিওয়াইডি নিজেদের কারখানায় তৈরি করে। অন্যদিকে টেসলার স্বনির্ভরতা ৬৮ শতাংশ।

বিওয়াইডি শুধু গাড়ির ব্যাটারি বা মোটর নয়, চিপসেট থেকে শুরু করে গাড়ির সিট পর্যন্ত সব নিজেরা বানায়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলছে, এই সক্ষমতার কারণেই করোনা মহামারির বিপর্যয়েও বিওয়াইডির উৎপাদন থমকে যায়নি। মূলত এই নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বিওয়াইডিকে বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার এখন মূলত উন্নত সফটওয়্যার ও সেমিকন্ডাক্টরের লড়াই। বিওয়াইডির দাবি, এটি তাদের সবচেয়ে উন্নত স্বায়ত্তশাসিত ড্রাইভিং চিপ ‘জুয়ানজি এ-থ্রি’।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি অন্য যেকোনো চিপের চেয়ে ২০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ খরচ করে গাড়ির মাইলেজ বৃদ্ধি করতে সক্ষম। আগে ইলেকট্রিক গাড়ির ড্যাশবোর্ড নিয়ন্ত্রণ, চালক সহায়তা প্রযুক্তি (এডিএএস) এবং ইঞ্জিন চালনা ব্যবস্থা আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে চলত।

তবে জুয়ানজি এ-থ্রি চিপের মাধ্যমে ল্যাপটপ আকারের একটি কেন্দ্রীয় কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মে এই সবকিছুকে একটি মাত্র সমন্বিত সফটওয়্যারের অধীনে নিয়ে এসেছে বিওয়াইডি।

গাড়ির বাজারে আসার আগে বিওয়াইডি ছিল ব্যাটারি নির্মাণের দিকপাল। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি পাঁচটি স্মার্টফোনের একটিতে বিওয়াইডির ব্যাটারি থাকে। অ্যাপল বা স্যামসাংয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও ব্যাটারির জন্য তাদের ওপর নির্ভর করে থাকে।

ব্যাটারি তৈরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিওয়াইডি ব্লেড ব্যাটারি নামের একটি প্রযুক্তি বাজারে এনেছে। লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) সমৃদ্ধ এই ব্যাটারি এতটাই নিরাপদ যে এটি গাড়ির কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করে।

এ ছাড়া অভিনব ‘ফ্ল্যাশ চার্জিং’ সিস্টেম এনেছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু গাড়ির মডেলে মাত্র ৫ মিনিট চার্জেই ব্যাটারির ৭০ শতাংশ পূর্ণ হয়। এই চার্জে অনায়াসে ৪০০ কিলোমিটার পথ চলা সম্ভব।

রপ্তানি বাজারে আধিপত্য বৃদ্ধি করতে এবং বিশ্বজুড়ে গাড়ি পৌঁছে দিতে বিওয়াইডি নিজস্ব কার্গো জাহাজ তৈরি করছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, ‘বিওয়াইডি এক্সপ্লোরার ১’ জাহাজটি এরই মধ্যে কয়েক হাজার গাড়ি নিয়ে ইউরোপের বন্দরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে ক্রেতার হাতে গাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এখন বিওয়াইডির একক নিয়ন্ত্রণে। ফলে পরিবহন খরচ কমিয়ে টেসলার চেয়ে অনেক কম দামে উন্নত মানের গাড়ি বাজারে ছাড়তে পারছে এই চীনা প্রতিষ্ঠান।

গত বছর জার্মানির মিউনিখে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মোটর শোতে বিওয়াইডির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেলা লি

মাস্ক বনাম চুয়ানফু, দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই

টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক পছন্দ করেন জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন। তিনি সারাক্ষণ প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু বিওয়াইডির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং চুয়ানফু ঠিক তার উল্টো।

ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে তাঁকে সরাসরি ‘অ্যান্টি-ইলন মাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। চুয়ানফু মূলত একজন নিভৃতচারী প্রকৌশলী। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে নিজের কাজিনের কাছ থেকে মাত্র ৩ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে ২০ জন কর্মী নিয়ে তিনি বিওয়াইডি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মিতব্যয়িতা নিয়ে অটোমোবাইল বিশ্বে একটি গল্প বেশ প্রচলিত।

একবার বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি সভার আগে নিজের কাছে ভালো শার্ট ছিল না বলে তিনি রাস্তার পাশের সাধারণ দোকান থেকে একটি সস্তা শার্ট কিনে পরে সভায় যোগ দিয়েছিলেন। চুয়ানফু মনে করেন, গ্ল্যামার নয় বরং প্রকৌশলগত উৎকর্ষই তাঁর প্রতিষ্ঠানের আসল শক্তি।

ফরচুন সাময়িকীর এক প্রতিবেদন বলছে, চুয়ানফু আজও শেনজেনে তাঁর কারখানার সাধারণ ক্যানটিনে কর্মীদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খান এবং আজও ল্যাবরেটরিতে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

ইলন মাস্ক বর্তমানে নানারকম রাজনৈতিক বিতর্ক আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে চুয়ানফু এখন যাতায়াতব্যবস্থার নতুন ভবিষ্যতের খোঁজ করছেন।

মজার বিষয় হলো, ২০১১ সালে ব্লুমবার্গের এক সাক্ষাৎকারে বিওয়াইডির গাড়ির কথা শুনে মাস্ক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন। কিন্তু আজ সেই মাস্কের বাজার কেড়ে নিয়েছেন এই মিতব্যয়ী প্রকৌশলী।

লন্ডন থেকে নয়াদিল্লি, বিওয়াইডি পৌঁছাচ্ছে সবখানে

বিওয়াইডি এখন আর কেবল চীনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। পুরো বিশ্বজুড়ে তাদের জয়জয়কার। লন্ডনের আইকনিক লাল ডাবল-ডেকার বাস থেকে শুরু করে মেক্সিকো সিটি, হংকং, নয়াদিল্লি কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের ট্যাক্সি সবখানেই এখন বিওয়াইডির শক্তিশালী উপস্থিতি। তাদের এই অগ্রযাত্রা রুখতে মরিয়া পশ্চিমা বিশ্ব।

তবে বিওয়াইডির এই জয়জয়কার রুখতে পশ্চিমা বিশ্ব এখন মরিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনা ইলেকট্রিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে শুল্কের এই বিশাল প্রাচীর বিওয়াইডিকে খুব একটা দমাতে পারছে না।

বিওয়াইডির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেলা লি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মার্কিন বাজার এখনই তাঁদের মূল লক্ষ্য নয়। এর চেয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের উদীয়মান বাজারগুলোতেই তাঁরা বেশি মনোযোগী।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনে একটি চার্জিং স্টেশনে নিজেদের বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার অপেক্ষায় চালকেরা। ২০২৩ সালে তোলা এই ছবি চীনের শক্তিশালী চার্জিং অবকাঠামো ও ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদাকেই ফুটিয়ে তোলে

তবে এই লড়াই কেবল শুল্ক বা বাণিজ্যের নয়। এর গভীরে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়িগুলো আসলে ‘চাকার ওপর একেকটি স্মার্টফোন’।

আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়িতে ডজনখানেক ক্যামেরা, রাডার এবং সেন্সর থাকে। এগুলো সারাক্ষণ রাস্তার নিখুঁত মানচিত্র ও আশপাশের সবকিছুর ডেটা সংগ্রহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভয়, এসব গাড়ি যদি মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশ দিয়ে চলে, তবে সেই ভিডিও বা ম্যাপ সরাসরি চীনের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে পৌঁছে যেতে পারে।

এ ছাড়া গাড়ির ভেতরে থাকা মাইক্রোফোন ও ফেসিয়াল রিকগনিশন সেন্সর চালকের কথোপকথন ও পরিচয় রেকর্ড করে। পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, বেইজিং এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি করতে পারে।

হোয়াইট হাউসের এক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব গাড়ি যেহেতু ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত, তাই বেইজিং চাইলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে দূর থেকে হাজার হাজার গাড়ি অকেজো করে দিতে পারে। বিষয়টি কোনো দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে স্থবির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বাণিজ্য যুদ্ধেও পশ্চিমা বিশ্ব এখন বিওয়াইডির কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। বিওয়াইডি ব্যাটারি ও চিপ তৈরিতে স্বনির্ভর হওয়ায় ফোর্ড বা জেনারেল মোটরসের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান খরচের লড়াইয়ে পেরে উঠছে না। এতে শত বছরের পুরোনো ব্র্যান্ডগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে কয়েক লাখ শ্রমিকের চাকরি।

চীন এখন শুধু গাড়ি বিক্রি করছে না; তারা বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নিয়ে নিচ্ছে।

বেইজিংয়ে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অটো শোতে বিওয়াইডির সাশ্রয়ী ইলেকট্রিক গাড়ি ‘সিগাল’ দেখছেন দর্শনার্থীরা। বৈশ্বিক বাজারে এই মডেলটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে

২০২৭ সালে চালকহীন গাড়ি

বিওয়াইডির উদ্ভাবনী ক্ষমতা এখন কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানাচ্ছে। সিএনএন ও ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিওয়াইডির প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ‘ইয়াংওয়াং ইউ-এইট’ মডেলের গাড়িটি জরুরি অবস্থায় পানির ওপর নৌকার মতো ভাসতে পারে এবং অনায়াসে পাড়ি দিতে পারে জলাশয়।

শুধু তা-ই নয়, এই গাড়িটি কোনো বাড়তি জায়গা না নিয়ে স্রেফ এক জায়গায় দাঁড়িয়েই ট্যাংকের মতো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে সক্ষম। এটিকে বলা হয় ‘ট্যাংক টার্ন’ প্রযুক্তি।

এমনকি জেমস বন্ডের সিনেমার মতো এই গাড়ির ছাদে রয়েছে ড্রোন স্টেশন। গাড়ি চলাকালে ড্রোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে গিয়ে সামনের রাস্তার জ্যাম বা পরিবেশের ভিডিও সরাসরি চালকের ড্যাশবোর্ডে পৌঁছে দেয়।

বিওয়াইডির ‘ইউ-নাইন’ মডেলের সুপারকার আরও একধাপ এগিয়ে। এটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে লাফ দিতে পারে এবং এমনকি একটি চাকা না থাকলেও ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে পারে।

চীনের এই গাড়ি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনের এই দৌড় সড়ক ছাড়িয়ে আকাশেও বিস্তৃত। রয়টার্স জানায়, হেলিকপ্টারের মতো সরাসরি উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম ‘ফ্লাইং ট্যাক্সি’ বা উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে কাজ করছে বিওয়াইডির সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে বিওয়াইডির আসল লক্ষ্য আরও অনেক দূরে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যেই পুরোপুরি চালকবিহীন গাড়ি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়তে কারিগরিভাবে প্রস্তুত তারা। এখন কেবল চীন সরকারের আইনি অনুমোদনের অপেক্ষা।

বিওয়াইডির নতুন ‘জুয়ানজি’ স্মার্ট আর্কিটেকচার প্রতিটি গাড়িকে মূলত একেকটি শক্তিশালী রোবটে পরিণত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের বৈশ্বিক পরিবহন বিপ্লবের মূল কারিগর হবে চীনের এই সাশ্রয়ী উচ্চপ্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আভিজাত্যের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে পারা বিওয়াইডির সবচেয়ে বড় শক্তি।

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, ব্লুমবার্গ

Read at source