গরুর কষা মাংস রান্না করে পাক্কা রাঁধুনিতে সেরা ফারহানা
· Prothom Alo

লটারিতে কারও ভাগ্যে ছিল গরুর মাংস, কারও মাছ, আবার কারও ভাগ্যে পড়েছে চিংড়ি, শুঁটকি কিংবা নানা পদের সবজি। আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ছিল চুলা আর হাঁড়ি–পাতিল। টেবিলজুড়ে সাজানো নানা পদের মাছ, মাংস, সবজি ও মসলা। হুইসেল বাজতেই শুরু হয় এক ঘণ্টার রান্নার পরীক্ষা।
Visit mchezo.co.za for more information.
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে কনফিডেন্স সল্ট-প্রথম আলো ‘পাক্কা রাঁধুনি’ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে এ চিত্র দেখা গেল। চট্টগ্রাম নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে কষা গরুর মাংস রান্না করে প্রথম পুরস্কার জিতে নেন রাঁধুনি ফারহানা চৌধুরী জলি।
কনফিডেন্স সল্ট-প্রথম আলো ‘পাক্কা রাঁধুনি’ প্রতিযোগিতায় অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরা। আজ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনেচট্টগ্রামে চতুর্থবারের মতো রান্নার এত বড় আয়োজন হলো। এতে অংশ নিতে ৫৭৮ রাঁধুনি আবেদন করেছিলেন। এরপর ৪০ জনকে দ্বিতীয় পর্বে, পরে সেখান থেকে ১০ জনকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য বাছাই করেন বিচারকেরা। চূড়ান্ত পর্বে বিচারক ছিলেন পেনিনসুলার নির্বাহী সু শেফ মো. জামাল হোসেন, রন্ধনশিল্পী জেবুন্নেসা বেগম, জোবাইদা আশরাফ ও পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা।
প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাঁধুনিরা প্রস্তুত করেন দেশীয় নানা ঐতিহ্যবাহী পদ। চুলায় রান্না হয় খাসির রেজালা, হাঁস ও কবুতরের মাংস, চিকেন কোফতা কারি, ইলিশের পানি খোলা, রূপচাঁদাসহ বাহারি সব আয়োজন। সুস্বাদু এসব রান্নার ঘ্রাণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। পদের বৈচিত্র্য ও স্বাদে মুগ্ধ বিচারকদের সেরা তিন রাঁধুনি নির্বাচন করতেও বেশ বেগ পেতে হয়।
রান্না ও বিচারপর্ব শেষে শুরু হয় প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণার আয়োজন। অতিথি ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী রাইসুল ইসলাম। তাঁর গান শেষে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। এ সময় অতিথিরা আয়োজনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। এ পর্বে সঞ্চালনা করেন আবৃত্তিশিল্পী সেলিম রেজা ও পৃথা পারমিতা। পুরো আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল প্রথম আলো বন্ধুসভা।
রান্না চেখে দেখছেন বিচারকেরা। আজ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনেমা ছিল অনুপ্রেরণা, শখের রান্না
পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ী ফারহানা চৌধুরী জলি বলেন, তিনি চট্টগ্রামের মেয়ে। তাই মঞ্চে ওঠার আগে তিনি মনে মনে চেয়েছিলেন তাঁর ভাগ্যে যাতে গরুর মাংসটাই পড়ে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল মেজবানি মাংস রান্না করার, তবে সময় স্বল্পতায় তিনি পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন।
খাট্টা-মিঠা (টক-মিষ্টি) পোস্ত দানা দিয়ে বাহারি রুই রান্না করে বিচারকদের মন জয় করেছেন মোহাম্মদ বাইজিদ। প্রথম রানারআপ হয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় রানারআপ হয়েছেন সাহিরা হোসাইন। তাঁর রান্না করা পদ ছিল ইলিশ মাছের পানি খোলা।
প্রথম রানারআপ হওয়া মোহাম্মদ বাইজিদ তাঁর মায়ের কাছ থেকেই রুই মাছ রান্নার পদটি শিখেছিলেন বলে জানান। তাঁর বাড়ি নরসিংদী জেলায়। অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মা এই রান্না করতেন। মায়ের হাতেই এই রান্না খেয়েছি। সেখান থেকেই শেখা। আমার মা মারা গেছেন ১৩ বছর হলো। আমি তাঁর রান্না নিয়েই এত দূর এসেছি।’
দ্বিতীয় রানারআপ সাহিরা হোসাইন বলেন, কক্সবাজারে ইলিশ এভাবে রান্না করা হয়। শখ থেকে রান্না করা। নিজের এলাকার রান্না সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এসেছেন তিনি।
রান্নায় ব্যস্ত এক প্রতিযোগী। আজ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনেগান, কথামালায় জমজমাট আয়োজন
আলোচনা পর্বের শুরুতে বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার। তিনি বলেন, একজন রন্ধনশিল্পীর মায়ের গল্প শুনে তাঁর গভীরভাবে মনে হয়েছে, গ্রামবাংলার ঘরের ভেতরের ঐতিহ্যবাহী রান্নাই এখন ধীরে ধীরে একটি স্বীকৃত পেশায় রূপ নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে প্রথম আলো এবং এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের রাঁধুনিরা অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।
প্রধান অতিথি ছিলেন আগ্রাবাদ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম। তিনি বলেন, একসময় রান্নাঘরকে শুধু নারীদের পরিসর হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলেছে। এখন পুরুষেরাও সমান আগ্রহ নিয়ে রান্নায় অংশ নিচ্ছেন। এটি সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ ধরনের সৃজনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
অতিথির বক্তব্যে কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ তৈয়ব বলেন, চার বছর ধরে প্রথম আলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধারাবাহিকভাবে এই আয়োজন করে আসছে কনফিডেন্স সল্ট। অংশগ্রহণকারী রাঁধুনিরা শুধু রান্না করছেন না, বরং তাঁদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে রান্নাশিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিযোগিতায় কেউ পরাজিত নয়, কারণ সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আসর জমান রাইসুল ইসলাম। আজ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনেকনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা (সিএমও) সরদার নওশাদ ইমতিয়াজ বলেন, শুরুতে প্রতিযোগিতাটি শুধু চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে রাঁধুনিদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ বাড়ায় এর পরিসর বিস্তৃত করা হয়। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারও এতে যুক্ত হয়েছে, যা আয়োজনটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজার নাজমুল হোসাইন সিদ্দিকি বলেন, ঘরের রান্নাকে অনেক সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু একজন রাঁধুনি প্রতিদিন যে শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে পরিবারকে রান্না করে খাওয়ান, তা পরোক্ষভাবে পরিবারের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। এই অবদানকে আরও স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম বলেন, তিনি লক্ষ্য করেছেন প্রতিযোগীরা শুধু সুস্বাদু রান্নাতেই মনোযোগী ছিলেন না, বরং খাবারের পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্যগত দিক এবং নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে তিনি মনে করেন।