একটি নাকফুল ফিরে পাওয়া

· Prothom Alo

আম্মু তাঁর পার্স হারিয়ে প্রায় দিশাহারা। সামান্য কিছু কেনাকাটার জন্যই তাঁর বাইরে যাওয়া, তা–ও আব্বুর অনুমতি সাপেক্ষে। আম্মুর এই বিশেষ গুণটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে। যেখানে যা প্রয়োজন হোক, সেটা আব্বুকে জানাবেন। আব্বু নিষেধ করলে কখনো কখনো ঘ্যানঘ্যান করেন। কিন্তু এই জানানোটা আব্বুও আপুকে প্রায় উদাহরণ হিসেবে শেখান। অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বলেন, ‘তোর আম্মুকে দেখে শিখ! এটা কিন্তু একটা চমৎকার আদর্শ একে অন্যকে সম্মানের ক্ষেত্রে!’ আম্মু এই নিয়ে দু–তিনবার আসা-যাওয়ার পথে খুঁজলেন। আমিও আম্মুকে সঙ্গ দিলাম। এই ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় কোথায় পাবে? কারও হাতে পড়ে থাকলে! নাহ,আমি তেমন আর কিছু ভাবলাম না। ‘আম্মু তোমার পাস ঠিক পেয়ে যাবা। তুমি অযথা এই রাস্তায় হয়রানি হচ্ছ খুঁজে খুঁজে। আর তা ছাড়া কী এমন মহামূল্যবান তোমার পার্সে আছে, যেটার লোভে পড়ে কেউ সেই পার্স পেয়ে গায়েব করে দেবে? কত টাকা ছিল?’ ‘সবকিছু কি টাকা দিয়ে হয় গাধা? টাকা হারালে আমি খুঁজতেই আসতাম নাহ।’ ‘তাহলে কী ছিল আম্মু? মোবাইল তো তোমার হাতেই?’ ‘তুই বুঝবি নাহ। চল..।’ আম্মু আমার হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকেও তাঁর চোখ এপাশ–ওপাশ করে পার্স খুঁজতে ছিল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কী এমন মহামূল্যবান জিনিসের জন্য আম্মু এত অস্থির? টাকাও তেমন বেশি নাহ, মোবাইলও নাহ। দামি গয়নাগাটি হলেও তো বলতেন।’ আম্মুর বিষয়টা যত সহজ আমি ভেবেছিলাম, বিষয় ছিল ততটাই গভীর ও তীব্র। আম্মু বাসায় সারাক্ষণই সেটা নিয়ে পড়ে থাকছেন। হাঁটতে–চলতে উঠতে–বসতে আফসোস করেই যাচ্ছেন। আম্মু ডিনারের জন্য খাবার পর্যন্ত গরম করলেন না। দিনের বাকিটা সময় টুকটাক কাজ করলেও সারাক্ষণই মুখে পার্স জপতে লাগলেন। রান্না করার সময়, ঝাড়ু দেওয়ার সময়, এমনকি বাথরুমে যেতে যেতেও আহাজারি করে বলতে লাগলেন, ‘দয়াময়, আপনি সব দেখেন, সব দ্রষ্টা আপনি। আমার পার্সটা পাইয়ে দাও!’ আম্মু কেমন নিস্তেজ হয়ে গেলেন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই।

আব্বু বাসায় ফিরে আসার আগপর্যন্ত আম্মু তার ঘরে উবু হয়ে শুয়ে রইলেন। আমি কয়েকবার যদিও কাছে গেলাম। রেসপন্স পেলাম না। আমারও কেমন একা লাগছিল। আব্বুকে যথারীতি ফ্রেশ করে আম্মু বললেন, ‘আমার সাথে একটু থানায় চলো তো! লস্ট কমপ্লেইন লিখাব।’ ‘সেকি, পার্স পাওনি এখনো?’, আব্বু অবাক হয়ে জানতে চাইলেন। ‘নাহ!’ বলেই আম্মু জল ছেড়ে দিলেন। আমি অনুশোচনা অনুভব করতে শুরু করলাম আম্মুর এই দুর্বলতা দেখে। সত্যিই বিষয়টা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হয়নি। আম্মুর অনুভূতিতে নিশ্চই এটা অনেক বিশেষ।‘আব্বু ক্লান্ত, বরং আমিই তোমার সাথে যাই আম্মু? আব্বু বরং একটু বিশ্রাম করুক!’ আমার এ কথা শুনে আম্মু চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, ‘তোকে তো দুপুরেই বললাম, তখন তো গুরুত্ব দিলি না!’ আমি আম্মুর কাছে গিয়ে হাত ধরে বললাম, ‘সরি আম্মু, আমি বুঝতে পারিনি!’ ‘আচ্ছা, তুমি থাকো, রেস্ট করো। ছেলের সাথেই যাই।’ আপুকে ডেকে বলে দিলেন যেন খাবারগুলো গরম করে রাখেন। আর আব্বু খেতে চাইলে যেন ব্যবস্থা করে দেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ট্যাক্সিতে আমি আম্মুর পাশেই বসলাম। আম্মু মনমরা হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি এই মুহূর্তে খুব অনুতপ্ত বোধ করছি। আম্মু তার হাত দুটি রানের ওপর গুটিয়ে বসে আছেন। আমি আম্মুর হাত দুটি আমার রানের ওপর নিয়ে এলাম। ‘সরি আম্মু, তোমার ফিলিংসটা পুরোপুরি অনুভব করতে পারিনি আমি। তোমার অনুভূতিকে আমার গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া উচিত সর্বোচ্চ।’ আমি আম্মুর হাত দুটি আমার বুকে চেপে ধরলাম, ‘সরি আম্মু!’ আম্মু এবার তাকালেন। তার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর রেস্ট করলেন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অফিসার আম্মুকে অভয় দিলেন, ‘আপনাকে খুবই বিষণ্ন মনে হচ্ছে। ডোন্ট অরি ম্যাম! আপনি অবশ্যই আপনার পার্সটি পেয়ে যাবেন। আমরা অতিদ্রুতই আপনাকে কন্ট্যাক্ট করব।’ আম্মু কিছুটা আশ্বস্ত মনে বের হলেন।

আমরা লস্ট কমপ্লেইন লিখিয়ে আবার ট্যাক্সি নিলাম। আম্মু আমাকে জড়িয়ে আগের ন্যায় কাঁধে হেলান দিয়ে থাকলেন। আমি আম্মুকে মৃদুভাবে রাবিং করে দিতে থাকলাম। আর মনে মনে লজ্জিত হলাম দুপুরেই আম্মুর কথায় থানায় আসিনি বলে। হয়তো এতক্ষণে আম্মু তার পার্স পেয়েও যেতেন।

রাতে খাবার টেবিল নির্জীব–প্রাণহীন মনে হলো। আম্মু প্রতিদিন খাবার সার্ভ করে দেন। সবাই প্রফুল্লচিত্তে খাওয়াদাওয়া করে। আজ তার ব্যতিক্রম। আম্মুর চোখেমুখে, তার নির্জীবতায় তার ভেতরের আবেগ ও অনুভূতি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আব্বুও রাতে তেমন খেলেন না। আমাদেরও খাওয়াতে কোনো তৃপ্তি হলো না।

পরদিন আব্বু আর অফিসে গেলেন না। আপুর হোস্টেলে ফেরার কথা থাকলেও আম্মুর অবস্থা বিবেচনা করে গেল না। এক রাতে আম্মুকে যেন চিরাচরিত চেহারার গ্ল্যামার থেকে হারিয়ে ফেললাম। সকাল থেকে আম্মু শুয়েই রইলেন। আমি আর আপু নাশতা তৈরি করলাম। একজনের ভাবনায় আমরা সবাই স্বাভাবিক সম্পর্কের শূন্যতা ফিল করছিলাম। আপুর সঙ্গে আমারও সেই সম্পর্ক পেলাম না। খুব স্বাভাবিকভাবে পুরোটা সময় কিচেনে কাটালাম। অথচ তেমন কোনো চঞ্চলতাই থাকল না। দরজায় নাড়া পড়তেই আম্মু উঠে এলেন। স্বাগত জানিয়ে আগত লোকটি আম্মুকে খুঁজলেন। ‘এইটাই কি আপনার পার্স?’ আম্মুর চোখেমুখে কী যে প্রশান্তি খেলে গেল, তা ব্যাখ্যাতীত। মুহূর্তেই তার নির্জীব–প্রাণহীন শরীরে যেন উচ্ছ্বাস বয়ে গেল। ‘হ্যাঁ, এটাই তো।’ ‘দেখুন সবকিছু ঠিক আছে কি না, যদিও আমরা খুলে দেখিনি। আপনার কমপ্লেইন অনুযায়ী চেকলিস্ট মিলিয়ে নিন।’ আম্মু চেকলিস্ট হাতে নিয়ে মিলিয়ে তাতে সাইন করে দিলেন। ‘আমি চিরকৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে অফিসার!’ ‘ম্যাম, আমরা আন্তরিক দুঃখিত যে আপনার মানসিক অস্থিরতা কম করার জন্য আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি নাই।’ অফিসারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হাত জোর করে বললেন, ‘আমার উচিত ছিল গতকালই সাথে সাথে পুলিশকে ফাউন্ড রিপোর্ট করা। কিন্তু আমি বিষয়টা আঁচ করতে পারিনি। আমার দায়িত্ব ও মূল্যবোধের অভাবে একজন মানুষ মানসিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা অনুধাবণে আমার ঘাটতি ছিল। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করবেন বিলম্বের জন্য। আর আপনার কষ্টের জন্য।’ আম্মু তাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার সব ক্লান্তি যেন ভুললেন।

আমরা সবাই খুব উৎসুক হয়ে দেখতে চাইলাম—কোন বিশেষ বস্তুর জন্য আম্মু একেবারে মৃতপ্রায় হয়ে গেলেন এই এক দিনেই। আম্মু নাকফুলটা বের করে বললেন, ‘এটার জন্য!’ আব্বু বললেন, ‘উফ, তুমি বললে তোমাকে কয়েকটা তো কিনে দেওয়া যেত। তুমি সে জন্য একেবারে আধমরা হয়ে যেতে বসেছিলে!’ আপু বলল, ‘আম্মু, একটা নাকফুলের জন্য মানুষ এমন করে?’

আমি ততক্ষণে ভেতর থেকে আবেগে, কৃতজ্ঞতায়, ভালোবাসায় ভেঙে গেলাম। কোনো ভাষাই এল না মুখে। এই নাকফুল তো আমিই আম্মুকে টাকা জুগিয়ে কিনে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ‘আম্মু এই বড় নাকফুলটায় তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগবে!’

সন্তানের দেওয়া সেই নাকফুল যে আম্মুর হৃদয়ে এত গভীরে প্রোথিত হয়ে রয়েছে, তা ভাবনার অনেক ঊর্ধ্বে। আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরে আবারও বললাম, ‘আই অ্যাম সরি আম্মু!’

Read at source