মানুষ হাসে কেন

· Prothom Alo

মানুষে কেন যে কাঁদে, তা আমরা সবাই জানি, কিন্তু মানুষে কেন হাসে, সেটা আমরা কেউ জানি না! এটা যে এক অদ্ভুত রহস্য—তা এই একুশ শতকেও অনাবিষ্কৃত—দর্শনে ও বিজ্ঞানে! তবে হাসি ও কান্নার মধ্যে একটা মৌল পার্থক্য এই যে বেদনা ও শোকে মানুষে কাঁদে একলা, একা নিভৃতে, পাঁচজনে মিলে নয়। পাঁচজনে মিলে যে কান্না, সে কেবল ক্রন্দনের অভিনয়। কথাটি শক্ত হলো অবশ্য। কিন্তু তা মিথ্যা নয়। কেননা শাস্ত্রমতে, যথার্থ শোক নীরব হয়। অথচ হাসি বস্তুর পুরোটাই সামাজিক ব্যাপার। একা ও একলা নয়, পাঁচজনে মিলেই ফেটে পড়ে হাসির উল্লাস! কেন এই উল্লাস?

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

এ নিয়ে পুরোনো দিনের বিদ্বানদের ধারণা—সমাজ আত্মরক্ষার জন্য হাসির সৃষ্টি করেছে। কী রকম সেটা? তাঁরা কল্পনায় ‘জীব’ ও ‘জড়’ নামে দুটি বস্তু ধরে নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রভেদ দেখিয়ে বলেছেন যে জড়ে ও জীবে পরম শত্রু। কীভাবে? জড় জীবকে গিলে ফেলতে চায়, নিজের মধ্যে নিয়ে তাকেও জড়ে পরিণত করতে চায়। অর্থাৎ সবকিছু আত্মসাৎ করে নেওয়ার প্রবৃত্তি তার মৌলস্বরূপ! বিদ্বানদের মতে, জীব এই দখলিস্বত্বের বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিবাদ জানায়, তারই নাম হাসি! একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা যাক।

ধরা যাক, কোনো স্থূলকায় লোক হঠাৎ পা পিছলে মাটিতে পড়ে গেল! এটা দেখে পাঁচজনে হাসিতে ফেটে পড়ে। এর কারণ ওভাবে পড়ে যাওয়াটা হচ্ছে জড়ের লক্ষণ। কেন? তেমন মুহূর্তে লোকের শরীর আড়ষ্ট হয়ে পড়ে বলে তখন তাকে দেখতে কাঠ-পাথরে গড়া বলে মনে হয়। তার মানে—মানুষের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যান্ত্রিকতা, অনমনীয়তা, স্বয়ংক্রিয়তা—এককথায় জড়ত্ব আছে। এটা তার চলার পথে, নানা কর্মে ও চিন্তায় প্রকাশ হয়ে পড়ে। যন্ত্রধর্মী এই ভাব ও রূপ বুদ্ধিমান মানুষে দেখতে চায় না। অথচ সেটাই যখন সে করে চলে, হাসির কারণটা সেখানেই ঘটে! সত্য যে পুনরাবৃত্তি, বৈপরীত্য এবং দ্ব্যর্থবোধের মধ্যেও বুদ্ধিমান মানুষের হাসি পায়। যাহোক, জড়ের ধর্মে যে হাসি, তা হাসির নিম্নস্তরের নজির অবশ্য। যে হাসি মনের এই জড়ত্বের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়, সে হচ্ছে হাসির উচ্চস্তর। এর দৃষ্টান্তের জন্য কিছু অপেক্ষা করা ভালো।

১.

হাসির কারণ তবে কী? তার আগে বলে নিতে হয় হাসির উপাদানের কথা। কোনো ঘটনা, কোনো চরিত্র কিংবা কোনো বাক্যে থাকে হাসির উপাদান। তার মানে—একধরনের মজার অর্থাৎ প্রহসনমূলক ভাবযুক্ত থাকে উল্লিখিত উপাদানে। এই সমবেত ভাবকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে—কমিক ইন সিচুয়েশন, কমিক ইন ক্যারেক্টার, কিংবা কমিক ইন ওয়ার্ডস। বোঝা যাচ্ছে, এর মধ্যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ও অদ্ভুত চরিত্র সাধারণভাবে হাস্যের কারণ হয়ে থাকে। অপরের ত্রুটি, অসংগতি ও দুর্বলতাও হাসি উৎপাদনের কারণ। কৌতুকমিশ্রিত বাক্য এবং অভিনয়ও হাসির উদ্রেক করে। সার্কাস ও পুতুলনাচে লোকে যে হাসিতে অস্থির হয়ে পড়ে, তার কারণ সেখানে প্রদর্শিত হয় পারস্পরিক সংগতিহীন অভিনয়।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
তবে অশ্লীলতা ও যৌনতাবিষয়ক আলোচনায় হাসির প্রবলতা ও উচ্ছ্বাস যে পরিমাণে তুমুল ঝড়ের বেগে উথলে ওঠে, অন্য বিষয়ে তত নয়। কেন? কারণ যা প্রকাশ্যযোগ্য নয়, যা রীতিমতো নিয়ম লঙ্ঘন এবং যা আচরিত প্রথার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ, তা–ই যখন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে, তখন তা বাঁধভাঙা হাসির খোরাক তৈরি করে।

তাহলে এ কথা নির্ভয়ে বলা চলে যে অসংগতি, বিসদৃশ ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা কিংবা চরিত্র হাস্যরসের প্রধান কারণ। তবে হাসি জিনিসটা সম্পূর্ণ আপেক্ষিক। একজনের কাছে যেটা বিশেষ কৌতুক ও বিস্ময়ের বিষয়, অপরজনের কাছে সেটা মনে না–ও হতে পারে। পুতুলনাচ দেখে শিশু যেমন মজা পায়, বয়স্ক লোকে তাতে বিস্মিত হয় না। কেননা বয়স্ক ব্যক্তি জানেন সে নাচ সৃষ্টির রহস্য। যেখানে সাধারণ বুদ্ধি ও স্বাভাবিক জ্ঞানের অনুপস্থিতি, সেখানেই হাসির কারণ। এর মধ্যে স্থান, কাল ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক অবশ্য। কেননা এই আবহ সংগতি বিরত হলে, হাসির খোরাক তৈরি করে। প্রত্যাশাহীনতাও হাস্যরসের কারণ হতে পারে। যে চরিত্রের থেকে আমরা সাধারণত যা প্রত্যাশা করি, তার অপূর্ণতায় যে অসংগতি দেখা দেয়, তা হাস্যাস্পদ হয়ে পড়ে। অনেক সময় অন্যের বিকৃতি, ভুল, দোষ ও দুঃখেও লোকের হাসি পায়। সমাজে যা অচল, অসুলভ ও বেমানান তা লোকের মনে হাস্য সৃষ্টি করে। অজ্ঞতা, মূর্খতা, নির্বুদ্ধিতায় লোকে কৌতুক অনুভব করলেও ভুল, অন্যমনস্কতা ও আত্মভোলা লোকের ভ্রান্ত আচরণে আমাদের হাসি পায়। বিজ্ঞানীর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে হাসির কিছু নেই। দার্শনিকের দর্শনতত্ত্ব সম্পর্কেও একই কথা। কিন্তু অনেক সময় তাঁদের শিশুসুলভ অজ্ঞতা ও অসহায়ত্ব লোকের মনে হাসির উদ্রেক করে। তবে অশ্লীলতা ও যৌনতাবিষয়ক আলোচনায় হাসির প্রবলতা ও উচ্ছ্বাস যে পরিমাণে তুমুল ঝড়ের বেগে উথলে ওঠে, অন্য বিষয়ে তত নয়। কেন? কারণ যা প্রকাশ্যযোগ্য নয়, যা রীতিমতো নিয়ম লঙ্ঘন এবং যা আচরিত প্রথার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ, তা–ই যখন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে, তখন তা বাঁধভাঙা হাসির খোরাক তৈরি করে।

২.

এ তো গেল হাসির দু-চারটি সাধারণ কারণ। যাঁরা এসব কারণ খুঁজে দেখার মাস্টারমশাই, তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞানী না হোন, দার্শনিকেরা চুপ করে বসে থাকেননি। বলা বাহুল্য, তাঁরা হাসির কারণ খোঁজায় ওস্তাদ। আবার হাসির নানা জাত ও শ্রেণিকরণেও তাঁদের জুড়ি নেই। তাঁরা হাসির স্থান নির্ণয় করতেও পিছপা হননি! তার মানে—হাসির জাতিভেদ সন্ধানেও তাঁরা বিশ্রামহীন। হাসি যে নীরব ও সরব দুই–ই হয়, এই কথা তাঁরাই আমাদের শুনিয়েছেন। তাঁরা আবার দেখাচ্ছেন, নীরব হাসির মধ্যে আছে বর্ণভেদ। কোনো হাসি চোখ থেকে উৎপন্ন হয়, কোনোটি-বা ঠোঁট থেকে। দন্তমূলীয় হাসিও নীরব হাসির অন্তর্গত। কুঞ্চিত ঠোঁট আর প্রসারিত ঠোঁটের হাসিও নাকি সবারই পরিচিত। অপরদিকে দন্তীয় হাসির মধ্যেও পাওয়া যায় শুষ্কতা ও সরসতার গন্ধ! অন্যদিকে যে হাসিকে বলা হয়েছে সরব—তার মধ্যে আছে দুই ভাগ—সংকট ও প্রকট। কেননা প্রকট থেকেই উৎপন্ন হয় উৎকট, বিকট আর অট্টহাসি! অর্থাৎ এসব জাতিভেদের মধ্যে দর্শনীয় তথা দেখা যায় এমন এবং শ্রাব্য বা শোনা যায়—এ রকমের শ্রেণিকরণই হাসির সর্বপ্রধান ভাগ। এই হাসির বর্ণভেদের মধ্যে নর–নারী দুই–ই ঢুকে পড়ে অনায়াসে। কিন্তু কোন হাসি নারীর আর কোন হাসি পুরুষের অধিকারভুক্ত, সে হিসাব তাঁদেরই করা উচিত যাঁরা এই হাসির মধ্যে নিজেদের দেখতে চান।

হাসির উদ্দেশ্য তবে কী? প্রধানত তার দুটি উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত, অপরকে আঘাত করবার ইচ্ছা; দ্বিতীয়ত,আত্মপ্রসাদ লাভের বাসনা। বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে গেল! কেননা এ দুইয়ের প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত ছাড়া লোকের মনে বিশ্বাস করানো কঠিন যে কারও হাসিতে কেউ আঘাত পায়! শুধু তা–ই নয়, এতে লোকে আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারে! হাসি যে লোককে আঘাত করতে পারে, তার সাক্ষী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নইলে তিনি আর সব ছেড়ে ‘নাগিনী’দের ‘হাস্য হেনে’ যেতে চাইবেন কেন? খুবই সংগত প্রশ্ন!

৩.

হাসি নিয়ে এবার একটি মৌল জিজ্ঞাসা উঁকি দিচ্ছে চোখের সামনে। হাসির কারণ যা–ই হোক—তার উদ্দেশ্যটা কী? প্রশ্নটা খুব বাজে রকম হতে পারে, কিন্তু এর থেকে মুক্তি প্রায় অসম্ভব! কেন? হাসির মধ্যেও কি উদ্দেশ্য খোঁজা শোভন? হ্যাঁ, শোভন। খুবই শোভন! রবীন্দ্রনাথই এই শোভনতাটা শিখিয়েছেন আমাদের। প্যাঁচটা তিনি লাগিয়ে দিয়েছেন গলার কাঁটার মতো! সেই যে রবীন্দ্রনাথ ‘জন্মদিন’ কবিতায় বললেন, ‘মানুষের দেবতারে/ ব্যঙ্গ করে যে-অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে/ তারে হাস্য হেনে যাব।’ খুবই অবাক হবার মতো বিষয়—যাঁর সামনে এমন নিদারুণ সংকট, তাঁর মুখে ও মনে কি হাসির কোনো ছিটেফোঁটাও থাকতে পারে? ‘ধিক্কার হেনে যাব’ বলাতে কী ভাবটা উপযুক্ত শোনাত না? হ্যাঁ, শোনাত অবশ্যই, কিন্তু তখন পুরো পৃথিবী দুঃখ আর পাপে যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথ যার জন্য বলেছেন, ‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’—চারদিকের বায়ু যে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, তা কি সহ্য করা যায়? মনুষ্যত্বের চরম আদর্শ পায়ে দলে সেদিন যেন বলিষ্ঠ শুভবুদ্ধিকেও হিংসায় আচ্ছন্ন করতে চেয়েছিল ফ্যাসিবাদ! রবীন্দ্রনাথই এসব কথা শুনিয়েছিলেন তখন পুরো বিশ্বকে! অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছেও তার প্রতিকারের ভাষা ছিল না, সেই বর্বরতাকে ‘হাস্য হেনে’ যাওয়া ছাড়া! অতএব হাসির উদ্দেশ্য আছে।

৪.

হাসির উদ্দেশ্য তবে কী? প্রধানত তার দুটি উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত, অপরকে আঘাত করবার ইচ্ছা; দ্বিতীয়ত,আত্মপ্রসাদ লাভের বাসনা। বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে গেল! কেননা এ দুইয়ের প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত ছাড়া লোকের মনে বিশ্বাস করানো কঠিন যে কারও হাসিতে কেউ আঘাত পায়! শুধু তা–ই নয়, এতে লোকে আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারে! হাসি যে লোককে আঘাত করতে পারে, তার সাক্ষী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নইলে তিনি আর সব ছেড়ে ‘নাগিনী’দের ‘হাস্য হেনে’ যেতে চাইবেন কেন? খুবই সংগত প্রশ্ন!

তবে বিজ্ঞানে দর্শনে—এমনকি ইতিহাসে ও সমাজতত্ত্বে এই দুই বাস্তবের নজির খুঁজতে যাওয়া বৃথা, পুরোপুরি! কেননা শতভাগ বুদ্ধি–আশ্রয়ী ও তত্ত্বনির্ভর রচনায় হাস্যরসের নাগাল পাওয়া কঠিন! আমাদের পরম সৌভাগ্য যে সাহিত্য এই হাসির অসামান্য নজির বুনে দিয়েছে সব শিক্ষিত লোকের মনে। কীভাবে? সাহিত্যের এক অপ্রতর্ক্যনীয় ধর্ম হচ্ছে, সে মানুষের মনে আত্মজ্ঞান সঞ্চারিত করে। দুই উপায়ে এটা সম্পন্ন হয়। প্রথমত, যুক্তিতর্কের সাহায্যে। দ্বিতীয়ত, বিদ্রূপের দ্বারা। দেখা যায়, যে লোক আমাদের মনের ওপর জ্ঞানের আলো ফেলেন, তাঁর ওপর আমরা খুব ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি—অপর দিকে যিনি হাসির আলো ফেলতে চান তাঁর ওপরেও তার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি! কেন? এর মৌল কারণ, জ্ঞানের চেয়ে হাসির মধ্যে বিদ্যমান তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের আগুনে আমাদের অন্তর পোড়ে বেশি! প্রমাণ কী? প্রমাণ এই যে শিল্পীর আঁকা একটি সাধারণ কার্টুনে সমগ্র দেশ জ্বলে ওঠে! অথচ ভারতবর্ষীয় উপাসক-সম্প্রদায়–এর জ্ঞানের ধারে-কাছেও দেশের দু–একজন উচ্চশিক্ষিত লোকের নাগাল পাওয়া কঠিন!

অথচ শুদ্ধ হাসির এই বিস্ময়কর বেগবান ধারা বাংলা সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে! কেন এমনটা হলো? এর প্রধান কারণ এই যে আজকের রাজনীতি ও শাস্ত্রে এই ‘হাস্য হেনে’ যাওয়া নিষেধ! অতএব আমাদের প্রতিজ্ঞা—আমরা আর হাসব না—সমাজজীবনেও না, সাহিত্যেও না! কেন? ‘আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’—আমাদের সাহিত্যিক সমাজ নজরুলের এই বিদ্রোহ পুরোপুরি বর্জন করেছেন! তাই এখন আমরা কেবলি কাঁদব, হাসব না! কেননা আমাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্লোগান—‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’!

এই হাসি যে গোলাবারুদের মতো দেশময় ছড়িয়ে দেয়, বাংলা সাহিত্যেও তার নজির প্রত্যক্ষ। আজ রাজনীতির পাশবিক আর নৃশংস প্রতাপে সাহিত্যের সেই অমিয় ধারায় প্রবাহিত হাসির কথা ভুলে গেলেও মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ভাঁড়ু দত্ত আর ভারতচন্দ্রের হীরা মালিনী থেকে নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের মুচিরাম গুড়ের কথা আমাদের পক্ষে অভুলনীয়। কেন? হাসি হচ্ছে জ্ঞানের চরম বস্তু—আত্মজ্ঞান যার জন্মগর্ভ! মধ্যযুগের কথা যদি ছাড়ি আর আধুনিক কালের বঙ্কিমচন্দ্রের কথা যদি ধরি, তবে দেখব যে কমলাকান্তের দপ্তর (১৮৭৫), মুচিরাম গুড়ের জীবন-চরিত (১২৯১) আর লোকরহস্য (১৮৭৪) বাঙালিকে উচ্চস্তরের হাসির ক্লাসিক উপহার দেয়—যার দুর্দান্ত প্রভাবে রবীন্দ্রনাথও যাওয়ার বেলায় ‘নাগিনী’দের চরম আঘাতটা হেনে চলে যেতে চেয়েছিলেন! ইতিমধ্যে আমরা জেনে এসেছি—সে কেবলি ‘হাস্য হেনে’!

৫.

এই যে উঁচু স্তরের হাসি, আমাদের সৃষ্ট সাহিত্যে তার প্রকাশ কী রূপ এবং কী নামে পরিচিত? আমরা সবাই জানি তার নাম ‘রম্যরচনা’ বা ‘রমণীয় রচনা’। এটা যে কী বস্তু আমরা অনেকে তা বুঝি না, অবশ্য। কেননা বস্তুটা ঠিক প্রবন্ধ নয়, অথচ তার মধ্যে তার মেজাজ থাকতে বাধা নেই। তবে প্রবন্ধের চেয়ে অনেক দামি জিনিস তাতে কাম্য। কী রকম সেটা? রম্যরচনার জ্ঞান হাস্যোজ্জ্বল, চিন্তা কষ্টহীন, রসবোধ সপ্রাণ। অভিজ্ঞতা এখানে প্রাত্যহিকের। কিন্তু স্রষ্টার মন একজন সূক্ষ্মদর্শীর। অর্থাৎ তাঁর মন যথার্থ পরিণত। লঘু ও অপরিণত মন নিয়ে এই উচ্চস্তরের এমন তীব্র ও গতিমান সাহিত্য নির্মাণ অসম্ভব। চিন্তা ও ভাবের সংযম এর মৌল শর্ত। অসংযমের পর্দা খুলে আনন্দ দেওয়া এর স্বভাববিরুদ্ধ। তার মানে—পুরোপুরি সেন্স থাকলেই কেবল এই ননসেন্স সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব! কেননা এটা একধরনের ননসেন্স সাহিত্যই আসলে। যে কথা আর কোনোভাবে কোথাও বলা চলে না, অর্থাৎ সমাজ মনের চরম অসামঞ্জস্যের হিসাব যখন আর কিছুতেই মেলানো যায় না, অথচ তার প্রকাশ অনিবার্য হয়ে পড়ে—তখনই কেবল এ–জাতীয় রচনার উদ্ভব হয়। সত্য যে এমন রচনা চমক লাগানোর জন্য নয়। তাই সস্তা-সুলভ চিন্তার প্রকাশ এমন শিল্পকর্মে সম্পূর্ণ বেমানান ও অবৈধ। এর মধ্যে থাকে কেবল তীক্ষ্ণ-চোখা শিল্পীর সর্বগ্রাহী অভিব্যক্তি—পাঠক তাতে শিল্পরস আস্বাদন করেও পেয়ে যায় একটা তুমুল দার্শনিক মেজাজের সতেজ পরিচয় ও প্রকাশ। ইতিমধ্যে বলা হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র এর ক্ল্যাসিক সৃষ্টিকর্তা। বঙ্কিম তাঁর ‘মুচিরাম’ ও ‘ঘটিরাম’কে আবিষ্কর করেছিলেন দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশীজামাই বারিক-এর ‘ঘটিরাম ডেপুটি’ এবং ‘ভোঁতরাম ভাট’ থেকে অবশ্য!

বঙ্কিম দেখিয়েছিলেন অশিক্ষিত, অযোগ্য, নির্লজ্জ, তোষামুদে এবং নির্বিকার পদলেহনের মাধ্যমে কীভাবে তারা উচ্চতম সম্মান ও পদমর্যাদা আদায় করে নেয়! সত্য যে প্রায় দেড় শ বছর ইংরেজ রাজত্বে বাস করে এবং পুরো এক শ বছর ইংরেজি শিক্ষা লাভ করে ‘ঘটিরাম’ ও ‘মুচিরাম’দের রাজত্ব বাংলায় ও বাঙালি জীবনে অমোঘ ও অম্লান হয়ে প্রবলরূপে বিরাজমান! ‘আদু ভাই’য়ের একজনও তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্বেচ্ছায় নিগর্মন করে না! অথচ শুদ্ধ হাসির এই বিস্ময়কর বেগবান ধারা বাংলা সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে! কেন এমনটা হলো? এর প্রধান কারণ এই যে আজকের রাজনীতি ও শাস্ত্রে এই ‘হাস্য হেনে’ যাওয়া নিষেধ! অতএব আমাদের প্রতিজ্ঞা—আমরা আর হাসব না—সমাজজীবনেও না, সাহিত্যেও না! কেন? ‘আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’—আমাদের সাহিত্যিক সমাজ নজরুলের এই বিদ্রোহ পুরোপুরি বর্জন করেছেন! তাই এখন আমরা কেবলি কাঁদব, হাসব না! কেননা আমাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্লোগান—‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’!

Read at source