তারুণ্যে ভর করে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াতের, ১২ প্রার্থী চূড়ান্ত

· Prothom Alo

সংসদ নির্বাচন জোটগতভাবে করলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিজেদের শক্তিতেই করতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী। সেই পরিকল্পনা নিয়ে ১২টি সিটি করপোরেশনে ১২ জন মেয়র পদপ্রার্থী ঠিকও করে ফেলেছে দলটি। এ ক্ষেত্রে তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে দলটির নেতাদের সূত্রে জানা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিয়েছিল ১১–দলীয় ঐক্য গড়ে। এই মোর্চায় আরও কয়েকটি ইসলামি দলের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনে এককভাবেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা।

Visit sportbet.reviews for more information.

দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একসময় শুধু রুকনদের (শপথধারী কর্মী) দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলেও এখন সেই নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কর্মী-সমর্থক এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই নীতি অনুসরণ করা হতে পারে।

এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণ নেতৃত্বকে। ২০২৪ সালের ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সামনে আনতে চায় জামায়াত। এই পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদেরও।

জামায়াত একসময় শুধু রুকনদের মনোনয়ন দিলেও এখন সেই নীতি থেকে সরে এসেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কর্মী-সমর্থক এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই নীতি অনুসরণ করা হতে পারে। এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণ নেতৃত্বকে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ ১০ মে প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব যোগ্যতায় কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত দলগুলো নিজ নিজ দলের প্রার্থী দেবে—এখন পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তই বহাল আছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

চার সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য স্থানীয় শাখাগুলোকে তিন সদস্যের প্যানেল পাঠাতে বলেছিল জামায়াত। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করেই সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চার সিটির প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করতে বলা হয়েছে। দলের আলাদা আলাদা দায়িত্বশীল সমাবেশ থেকে তাঁদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী করা হচ্ছে দলের মহানগর শাখার আমির আবদুল জব্বারকে। তিনি ২০১২–২০১৩ মেয়াদে শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি এবং ২০১৪–২০১৫ মেয়াদে সভাপতি ছিলেন।

গাজীপুর সিটিতে মেয়র পদে দলটির প্রার্থী হচ্ছেন হাফিজুর রহমান, যিনি তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি। তাঁকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৬ আসনে প্রার্থী করেছিল জামায়াত। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি প্রার্থিতা হারান।

চার সিটিতে জামায়াতের মেয়র প্রার্থীরা (ওপরে বাঁ থেকে) নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বার এবং গাজীপুরে হাফিজুর রহমান; (নিচে বাঁ থেকে) চট্টগ্রামে শামসুজ্জামান হেলালী এবং রংপুরে এ টি এম আজম খান।

চট্টগ্রাম সিটিতে প্রার্থী করা হচ্ছে জামায়াতের চট্টগ্রাম নগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালীকে। সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে দলের প্রার্থী ছিলেন, তবে জিততে পারেননি। রংপুরে সিটিতে প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহানগর আমির এ টি এম আজম খান।

ঢাকার দুই সিটিতে কারা

জামায়াতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় আছেন। দক্ষিণে আলোচনায় রয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)।

সম্প্রতি সাদিক কায়েমকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনারও সৃষ্টি হয়। তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় পর্যন্ত তাঁর ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। পাশাপাশি ছাত্রত্ব শেষ হলে ছাত্রশিবিরে তিনি আর থাকবেন না। ফলে প্রার্থী হতে সাংগঠনিক কোনো বাধা থাকবে না।

ঢাকা উত্তর সিটিতে সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাদিক কায়েম জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী

জামায়াত সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণে এনসিপির পক্ষ থেকে তাঁদের দলীয় মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জোটের প্রার্থী করার প্রস্তাব ছিল। তবে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই এ প্রস্তাবে আপত্তি তোলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁকে সমর্থন দিলে রাজনৈতিক দায়ভার জামায়াতের ওপরই পড়বে। সে কারণে ঢাকা দক্ষিণে সমঝোতার সম্ভাবনা কম।’

কেন একক পথে?

জামায়াতের ভেতরে এখন বড় আলোচনা—জোটগত নির্বাচন নাকি একক লড়াই। দলটির নেতারা বলছেন, অতীতে বিএনপির সঙ্গে চার–দলীয় জোটে থেকেও আলাদাভাবে নির্বাচন করে তাঁরা তুলনামূলক বেশি সফলতা পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই এবার একক প্রস্তুতির পেছনে বড় কারণ।

জামায়াত নেতারা মনে করছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে এবং জামায়াতের জনসমর্থনও বেড়েছে। নিজেদের এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন তাঁরা। তাই স্থানীয় পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচন করতেই বেশি আগ্রহ তাঁদের।

দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে এবং জামায়াতের জনসমর্থনও বেড়েছে। নিজেদের এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে দলটি। তাই স্থানীয় পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচন করতেই বেশি আগ্রহ তাদের।

এককভাবে এগোচ্ছে এনসিপিও

জোটের আশা না ছাড়লেও এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। গত ২৯ মার্চ ঢাকার দুই সিটিসহ পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। সর্বশেষ গত রোববার ১০০ পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়। ২০ মে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণার কথা রয়েছে।

১০০ উপজেলা–পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে গত ৫ মে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা

তবে এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা এখনো ১১-দলীয় ঐক্যের হয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছেন।

এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জোটগতভাবে নির্বাচন হবে, নাকি এককভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে হবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রস্তুতির লক্ষ্য থেকে তাঁরা এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন।

হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামীপ্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব যোগ্যতায় কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জেলা-উপজেলার প্রার্থী যাচাইয়ে জামায়াত

জামায়াতের সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন গতি পেয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশকে ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে অঞ্চল পরিচালক মনোনীত করেছে দলটি। তারা এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রথম ধাপে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ প্রায় শেষ। এরপর নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা হলে দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন এবং তৃতীয় ধাপে গণসংযোগ শুরু হবে।

৫০ শতাংশের বেশি ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করে তাঁদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। কিছু এলাকায় বাস্তবতার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।

দ্রুত নির্বাচন চায় জামায়াত

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্বে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর ১১টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক পদে বসিয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিএনপির শাহাদাত হোসেন মেয়রের পদে রয়েছেন। বিএনপির এমন রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচন আলাদাভাবে করতে চাইলেও নানা দাবিতে রাজপথে এখনো একসঙ্গে কর্মসূচিতে রয়েছে ১১–দলীয় ঐক্য

দলীয় প্রশাসকদের রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এমন মত জামায়াতের। তাই তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে না। তাই দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে।

নির্বাচন কবে?

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়সীমার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ঈদুল ফিতরের পর থেকে সারা বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলবে, এ কথা গত ১ মার্চ বলেছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ। তার দুই মাস গড়ালেও এখনো নির্বাচনের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।

৫ মে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে।

একই দিন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু হবে। আর স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন শেষ হতে নির্বাচন শুরুর পর ১০ মাস থেকে ১ বছর লাগতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই মাঠ গোছাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে শেষ পর্যন্ত জোটগত সমঝোতা হবে, নাকি আলাদা লড়াই—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের তফসিল ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

Read at source