রাখাল থেকে বিচারপতি: এক অনন্য সততার গল্প
· Prothom Alo

মক্কার উপকণ্ঠে এক কিশোর বকরি চরাচ্ছে। পায়ে ধুলো, গায়ে অতি সাধারণ পোশাক। হঠাৎ সেখানে এসে থামলেন দুজন পথিক—আবু বকর (রা.) ও রাসুলুল্লাহ (সা.)। মরুভূমির গরমে তাঁরা ক্লান্ত ও পিপাসার্ত। কিশোরকে ডেকে তাঁরা একটু দুধ চাইলেন।
কিন্তু কিশোর সরাসরি অস্বীকৃতি জানাল। সে বলল, ‘বকরি যেহেতু আমার নয়, তাই মালিকের অনুমতি ছাড়া আমি দুধ দিতে পারব না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৫৯৮)
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কিশোরের এই সততায় রাসুল (সা.) মুগ্ধ হলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘তাহলে এক কাজ করো, এখনো বাচ্চা দেয়নি এমন একটি বকরি নিয়ে এসো।’ কিশোর তা নিয়ে এলে রাসুল (সা.) সেটির ওলানে হাত বুলিয়ে দোয়া করতেই তা দুধে ভরে উঠল। (আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানি, দালায়িলুন নুবুওয়াহ, ২/৪৬-৪৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
এই অলৌকিক ঘটনায় কিশোর অভিভূত হয়ে পড়ে। সে আরজি জানাল, ‘আপনি কী দোয়া পড়লেন, আমাকে কি তা শেখাবেন?’ রাসুল (সা.) সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সততার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সেই কিশোরের নাম আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ। মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে উকবা ইবনে আবু মুয়িতের বকরি চরানোই ছিল তাঁর কাজ।
বদর থেকে শুরু করে প্রতিটি যুদ্ধে তিনি সামনের কাতারে ছিলেন। হোনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল, তখনো যে কজন সাহাবি রাসুলের পাশে অবিচল ছিলেন, আবদুল্লাহ ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
সেদিন থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন নবীজির বিশ্বস্ত খাদেম। খুব অল্প যে কজন সাহাবির সরাসরি নবীজির ঘরে যাওয়ার অনুমতি ছিল, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ তাঁদের একজন। তিনি নবীজির জুতো রাখতেন, মেসওয়াক এনে দিতেন, সফরে সঙ্গী হতেন। এভাবে সরাসরি নবীজির মুখ থেকে তিনি সত্তরটির বেশি সুরা শিখেছিলেন। (ইবন আবদিল বার, আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব, ৩/৯৮৭, দারুল জিল, বৈরুত এবং সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০০)
মহান তাবেয়ি সাইদ ইবনে জুবাইরশত্রুর মুখে একা দাঁড়িয়ে
ইসলামের শুরুর দিকে কাফেরদের ভয়ে মুসলমানরা কোরআন পাঠ করতেন লুকিয়ে। কাবার পাশে প্রকাশ্যে তেলাওয়াত করার সাহস ছিল না কারও। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একদিন বললেন, ‘আমি পড়ব।’ সাহাবিরা তাঁকে সতর্ক করে বললেন, ‘তোমার তো কোনো শক্তিশালী গোত্র নেই, কাফেররা আক্রমণ করলে কে রক্ষা করবে?’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘আল্লাহ।’
পরদিন সকালে কাবার পাশে মুশরিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি উচ্চস্বরে তেলাওয়াত শুরু করলেন। ক্ষুব্ধ মুশরিকরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এলোপাতাড়ি মারের মুখে মুখ রক্তাক্ত হলো, শরীর ফুলে গেল, তবু তিনি তেলাওয়াত থামালেন না। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৩৬৭, দারুল জিল, বৈরুত)
বদর থেকে শুরু করে প্রতিটি যুদ্ধে তিনি সামনের কাতারে ছিলেন। হোনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল, তখনো যে কজন সাহাবি রাসুলের পাশে অবিচল ছিলেন, আবদুল্লাহ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৭৫)
শহীদ হতে ব্যাকুল এক সাহাবিকোষাধ্যক্ষ ও বিচারক
পরবর্তীকালে হজরত ওমর (রা.) তাঁকে কুফায় পাঠালেন বিচারক ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে। কুফার কোষাগারে তখন অঢেল সম্পদ। সহস্র মানুষের বেতন আর সামরিক খরচ যাঁর হাত দিয়ে ব্যয় হতো, সেই মানুষটি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন চরম নির্লোভ ও নিঃস্ব। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৬/৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তিনি এতটাই কঠোর ছিলেন যে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা বন্ধু-বান্ধবও তাঁর কাছ থেকে এক পয়সার বাড়তি সুবিধা পায়নি।
রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় যে চারজন সাহাবির কাছ থেকে কোরআন শিখতে বলেছিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ছিলেন তাঁদের প্রধান।
রইসুল মুফাসসিরিন
রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় যে চারজন সাহাবির কাছ থেকে কোরআন শিখতে বলেছিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ছিলেন তাঁদের প্রধান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৯৯)
তিনি বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, এমন কোনো আয়াত নাজিল হয়নি যার প্রেক্ষাপট ও স্থান সম্পর্কে আমি জানি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০০২)
এই অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে পরবর্তীকালে আলেমরা তাঁকে ‘রইসুল মুফাসসিরিন’ বা তাফসিরবিদদের নেতা হিসেবে গণ্য করেন।
হিজরি ৩২ সনে মদিনায় এই মহান সাহাবির ইন্তেকাল হয়। তখন তাঁর বয়স ৬২ বা ৬৩ বছর। মৃত্যুর আগে খলিফা ওসমান (রা.) তাঁকে দেখতে এসে কিছু অর্থ-সহায়তা দিতে চাইলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দিলেন।
ওসমান (রা.) যখন তাঁর মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা বললেন, তখন আবদুল্লাহ (রা.) বললেন, ‘আমি তাদের সুরা ওয়াকিয়া পড়তে শিখিয়ে দিয়েছি। কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত সুরা ওয়াকিয়া পড়বে, তার কখনো অভাব হবে না।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৬২ এবং ইমাম বায়হাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ২৪৯৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
বিশ্বস্ত সাহাবি সেনাপতি আবু উবাইদা