চারুকলার দুই ফুল 

· Prothom Alo

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সম্মুখদেয়াল–লাগোয়া ফুটপাত ধরে হাঁটলে দুটি ফুল নিশ্চিত চোখে পড়বে—একটি সাদা বা সুরভি রঙ্গন। সারা বছরই ফুল ফোটে। অন্যটি হলুদ রঙের ট্যাবেবুইয়া। ফুল ফোটার সময় ফাল্গুন, মানে বসন্ত। শুধু এই দুটি ফুলই নয়, চারুকলা প্রাঙ্গণজুড়েই অজস্র গাছের মেলা। গাছের ঘনত্ব এতই বেশি যে ভেতরের ঘরগুলো ভালোভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। যার কোনো কোনোটি দুষ্প্রাপ্যও বলা যায়। রাজধানীর মূলকেন্দ্রে এমন ছায়াঘন শিক্ষায়তন খুব কমই আছে। এখানকার কয়েকটি গাছ স্মৃতিবিজড়িত।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

সেসব গাছ দেখতে মাঝেমধ্যে ভেতরে ঢুকে পড়ি। দুবার রোপণ করার পরও লালসোনাইলগাছ বাঁচিয়ে রাখা গেল না। যত্ন করে রোপণ করা রুদ্রপলাশও হতাশ করল আমাদের! এসব নিয়ে অনেক আক্ষেপ বৃক্ষপ্রেমী অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যের। ২০১৩ সালে কলকাতা থেকে হলুদ রঙের এই ট্যাবেবুইয়ার চারা নিয়ে আসেন তিনি। এই গাছকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অনেক কসরত করতে হয়েছে তাঁকে। অবশেষে চার বছর ধরে ফুল ফুটছে গাছটিতে। তিনি জানালেন, পশ্চিমবঙ্গে গাছটির নাম ফাল্গুনী বা ফাগুন বউ। দক্ষিণ ভারতের ভেলোরে অবস্থিত ফোর্ট ভ্যালোরে ২০১৮ সালে এই প্রজাতির প্রায় শতবর্ষী কয়েকটি গাছ দেখেছি। দেশের আর কোথাও এই প্রজাতির ট্যাবেবুইয়া চোখে পড়েনি। ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবস্থিত গাছটির ফুল হলুদ হলেও প্রজাতি আলাদা।

হলুদ রঙের এই ট্যাবেবুইয়ার ইংরেজি নাম ক্যারিবিয়ান ট্রাম্পেট ট্রি বা সিলভার ট্রাম্পেট ট্রি। ট্যাবেবুইয়া সাধারণত (Tabebuia aurea) ১৫ থেকে ২৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পাতা রুপালি রঙের, মনোরম, প্যাঁচানো ও ঝুলন্ত ডালপালা, কাণ্ডের ওপর গভীর খাঁজযুক্ত রুপালি রঙের বাকল থাকে। গাছের চূড়া সাধারণত অপ্রতিসম এবং দু-তিনটি প্রধান কাণ্ড বা শাখায় ঝোপালো থাকে। পাতা সরু ও লম্বাটে, যা এই গাছের একটি শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য ট্যাবেবুইয়ার সঙ্গে এর প্রধান পার্থক্য পাতায়। সরু পাতার ট্যাবেবুইয়া খুব একটা দেখা যায় না। ফুলের মৌসুমে বিক্ষিপ্তভাবে, ডালের ডগায় গুচ্ছাকারে দুই থেকে তিন ইঞ্চি লম্বা, সোনালি হলুদ রঙের, ট্রাম্পেট বা মাইক-আকৃতির অসংখ্য ফুল ফোটে। ফুল ফোটার ঠিক আগে সব পাতা ঝরে যায়। ফুল ছাড়াও আঁকাবাঁকা কাণ্ড, কর্কের মতো বাকল এবং রুপালি পাতার সংমিশ্রণে এটি একটি চমৎকার বৃক্ষ। এই ট্যাবেবুইয়া রোপণ করে ফুল ফোটানো সহজ। তবে অসুবিধা হলো কাণ্ড ও ডালপালা নরম হওয়ায় প্রবল বাতাসে খুব সহজেই উপড়ে পড়ে বা ডালপালা ভেঙে যায়।

ফুটেছে সুরভি রঙ্গন। চারুকলা অনুষদের সম্মুখদেয়ালের পাশে

হলুদ ট্যাবেবুইয়ার পাশেই আছে সাদা বা সুরভি রঙ্গন। সাধারণত রঙ্গন ফুলের চোখধাঁধানো রং দেখেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অথচ সাদামাটা রঙের সুগন্ধি রঙ্গনই আমাদের মন ভরিয়ে দিতে পারে। রঙ্গনের সুরভি পেতে হলে আমাদের যেতে হবে রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এবং চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে। অথবা বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ বিভিন্ন পার্ক ও উদ্যানেও দেখা মিলতে পারে এ ফুলের। বর্তমানে দীর্ঘস্থায়ী প্রস্ফুটনের কারণে উদ্যানসজ্জায় বিচিত্র বর্ণের রঙ্গন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ কারণে বিশ্বজুড়ে রঙ্গনের অসংখ্য রকমফের চোখে পড়ে। আবিষ্কৃত হচ্ছে আরও নতুন নতুন আবাদিত জাত। কিন্তু সচরাচর দেখা রঙ্গন থেকে আলোচ্য সুরভি রঙ্গন (Ixora finlaysoniana) অনেকটাই আলাদা। স্থানবিশেষ এটি একটি গুল্ম বা ছোট আকৃতির বৃক্ষের মতো দেখতে। এই রঙ্গন মিষ্টি সুবাসের জন্যও অন্যান্য রঙ্গনের চেয়ে আলাদা। কিন্তু এ ফুলটির সুগন্ধের খবর অনেকেরই অজানা।

সুরভি রঙ্গন ৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পত্রফলক ডিম্বাকার থেকে বিডিম্বাকার, মসৃণ এবং গোড়া গোলাকার। দেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া আমাদের নিকটবর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারেও সহজদৃষ্ট। বংশবৃদ্ধি বীজ ও কলমে। 

Read at source