হাজিদের সেবায় সুলতানা জুবাইদার কালজয়ী কীর্তি

· Prothom Alo

১৯৩ হিজরির এক তপ্ত দুপুর। মক্কার আকাশ থেকে যেন আগুনের হলকা ঝরছে। মাইলের পর মাইল মরুপথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হাজিরা যখন পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে পৌঁছাচ্ছেন, তখন ইবাদতের স্বস্তির চেয়েও পানির তৃষ্ণা তাঁদের বেশি দিশেহারা করে তুলছে।

সেসময় মক্কার শুষ্ক বুক চিরে বের হওয়া জমজম কূপের পানি প্রয়োজনের তুলনায় ছিল যৎসামান্য। এক বালতি পানির দাম ২০ দিরহামে (রৌপ্যমুদ্রা) গিয়ে ঠেকেছে—যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের অনেক বাইরে।

Visit newssport.cv for more information.

হাজিদের এই নিদারুণ কষ্ট দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন এক নারী। তিনি কোনো সাধারণ পথিক বা হজযাত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম জাহানের প্রতাপশালী খলিফা হারুনুর রশিদের প্রিয়তমা পত্নী এবং খলিফা আল-মানসুরের নাতনি সুলতানা জুবাইদা বিনতে জাফর।

জুবাইদার শৈশব কেটেছিল রাজকীয় বিলাসিতায়। তাঁর দাদা আদর করে তাঁকে ‘জুবাইদা’ বা ‘ছোট মাখনের টুকরো’ বলে ডাকতেন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর হৃদয়ে ছিল আর্তমানবতার প্রতি এক গভীর মমতা।

হাজিদের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে তিনি কেবল চোখের জল ফেলে ক্ষান্ত হননি; বরং এক দুঃসাহসী সংকল্প গ্রহণ করলেন। তিনি স্থির করলেন, বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত হাজিদের দীর্ঘ যাত্রাপথে সুপেয় পানির এক চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করবেন।

অসাধ্য সাধনের মহাকাব্য

সম্রাজ্ঞীর এই পরিকল্পনার কথা শুনে বাঘা বাঘা প্রকৌশলীরা কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেললেন। বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মাইলের এই বন্ধুর পথটি পাহাড়ে ঘেরা। সেখান দিয়ে পানির উৎস খুঁজে বের করা এবং তা মরুভূমির বুক চিরে মক্কায় নিয়ে আসা এক প্রকার অসম্ভব কল্পনা বলেই মনে হচ্ছিল।

ইরাকের নুমান উপত্যকা থেকে তায়েফ ও আরাফার বুক চিরে ৯০০ মাইল দীর্ঘ এক বিশাল খাল খননের কাজ আরম্ভ হলো। হাজার হাজার শ্রমিক দিনরাত কঠিন পাথর কেটে পানির গতিপথ তৈরি করতে লাগলেন।
দামেস্কের কিংবদন্তি আলেম ইমাম ইবনে আসাকির

প্রকৌশলীরা যখন বিশাল খরচের দোহাই দিয়ে পিছু হটতে চাইলেন, তখন মহীয়সী জুবাইদা যে কথাটি বলেছিলেন, তা ইতিহাসে আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করলেন— ‘কোদালের প্রতিটি কোপের বিনিময়ে যদি আমাকে এক একটি স্বর্ণমুদ্রাও ব্যয় করতে হয়, তবুও আমি এই কাজ শেষ না করে পিছু হটব না।’

শুরু হলো এক মহাযজ্ঞ। ইরাকের নুমান উপত্যকা থেকে তায়েফ ও আরাফার বুক চিরে ৯০০ মাইল দীর্ঘ এক বিশাল খাল খননের কাজ আরম্ভ হলো। হাজার হাজার শ্রমিক দিনরাত কঠিন পাথর কেটে পানির গতিপথ তৈরি করতে লাগলেন।

সম্রাজ্ঞী জুবাইদা এই প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিলের মুখাপেক্ষী হননি। তিনি ছিলেন এক অনন্য দূরদর্শী উদ্যোক্তা। নিজের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে তিনি এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করেন। তথ্যমতে, সেসময়ে প্রায় ১৭ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল, যা বর্তমানের হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান।

মরুপথে অনন্য সেবা

এই বিশাল কর্মপ্রচেষ্টা কেবল একটি খালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ‘দারবে জুবাইদা’ বা ‘জুবাইদার পথ’ নামক এক পূর্ণাঙ্গ রুট তৈরি করেছিলেন। ৯০০ মাইলের এই দীর্ঘ পথে তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল অসংখ্য বড় বড় জলাধার, ক্লান্ত মুসাফিরের জন্য আরামদায়ক সরাইখানা এবং রাতের অন্ধকারে পথ দেখানোর জন্য সুউচ্চ বাতিঘর।

প্রকৌশলগত দিক থেকেও এটি ছিল বিস্ময়কর। মরুভূমির প্রখর তাপে যাতে পানি বাষ্পীভূত হয়ে না যায়, সেজন্য করা হয়েছিল ভূগর্ভস্থ নালা ও বিশেষ আচ্ছাদনের ব্যবস্থা।

নারীদের হাদিসচর্চার চমকপ্রদ কাহিনি

প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যখন এই পথ পাড়ি দেন, তখন তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন—যদি জুবাইদা এই উদ্যোগ না নিতেন, তবে হাজিদের পক্ষে এই দুর্গম পথ অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব হতো।

এক বালতি পানির জন্য হাজিদের হাহাকার তাঁকে যে অস্থিরতা দিয়েছিল, তার বিনিময়ে তিনি পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলেন এক চিরস্থায়ী সদকায়ে জারিয়া।

প্রজ্ঞা ও বিনয়ের প্রতিচ্ছবি

সম্রাজ্ঞী জুবাইদা কেবল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অনন্য জ্ঞানতাপসী। কোরআন, হাদিস, ইতিহাস ও চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর ছিল গভীর পাণ্ডিত্য।

বলা হয়ে থাকে, তাঁর রাজপ্রাসাদে সবসময় একশো দাসী উচ্চস্বরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন, যার গুঞ্জন দূর থেকে শুনলে মনে হতো মৌমাছির গুঞ্জন। ক্ষমতার জাঁকজমক তাঁকে মহান রবের ইবাদত ও জনকল্যাণ থেকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি।

হিজরি ২১৬ খ্রিষ্টাব্দে এই মহীয়সী নারী পরলোকগমন করেন। তাঁর দৈহিক মৃত্যু হলেও ‘নহরে জুবাইদা’ প্রায় এক হাজার বছর ধরে মক্কার হাজিদের তৃষ্ণা মিটিয়ে তাঁর অমর কীর্তির সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে।

আজকের আধুনিক যুগেও জুবাইদা বিনতে জাফর (র.) আমাদের এক মহান শিক্ষা দিয়ে যান—ক্ষমতা ও সম্পদ কেবল ভোগের সামগ্রী নয়, বরং তা আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যম।

এক বালতি পানির জন্য হাজিদের হাহাকার তাঁকে যে অস্থিরতা দিয়েছিল, তার বিনিময়ে তিনি পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলেন এক চিরস্থায়ী সদকায়ে জারিয়া। তাঁর এই আত্মত্যাগ ও দূরদর্শী চিন্তা আজও মানবসেবা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের এক চিরন্তন প্রেরণা।

তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৫৪৩-৫৪৫; সিয়ারে আলামিন নুবালা, জাহাবি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৩৩৪-৩৩৬; তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদি, পৃষ্ঠা: ৪৩৩-৪৩৪

  • মুজিব হাসান: গদ্যকার, ভাষা সম্পাদক

বাদশা নাজ্জাশির উদারতার কাহিনি

Read at source