বিসিএস ফলাফলে ঢাকা বিভাগ ওপরে, কেন পিছিয়ে সিলেট ও বরিশাল
· Prothom Alo

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন ও চূড়ান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে বিভাগগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ৪৪তম থেকে ৪৯তম (৪৬ ও ৪৭ বাদে) বিসিএস পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগ থেকে যেমন সর্বোচ্চসংখ্যক আবেদন জমা পড়ছে, তেমনি ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের তালিকায়ও এই বিভাগের প্রার্থীরা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। তবে আবেদনের বিপরীতে সুপারিশ বা উত্তীর্ণ হওয়ার হারের দিক থেকে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগ প্রায়ই ঢাকাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আবেদনের তুলনায় সাফল্যের হার—
পিএসসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪৪তম বিসিএসে ঢাকা বিভাগ থেকে আবেদন করেছিলেন ৭১ হাজার ৪৮০ জন এবং সুপারিশ পেয়েছেন ৩১৯ জন (সাফল্যের হার ১৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ)। বিপরীতে রাজশাহী বিভাগে ৫২ হাজার ৭২৯ জন আবেদন করে ২৭৫ জন সুপারিশ পেয়েছেন, যার হার ১৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ আবেদনের অনুপাতে সাফল্যের দৌড়ে ঢাকার চেয়ে রাজশাহী এগিয়ে।
Visit mchezo.life for more information.
একই চিত্র দেখা যায় ৪৫তম বিসিএসেও। সেখানে ঢাকা বিভাগের সাফল্যের হার ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ হলেও রাজশাহী বিভাগের হার ১৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের হার ১৬ দশমিক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে সিলেট বিভাগ আবেদনের সংখ্যা ও সাফল্যের হার—উভয় ক্ষেত্রেই তলানিতে রয়েছে। ৪৪তম বিসিএসে সিলেটের সাফল্যের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ৪৫তম বিসিএসে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। বরিশাল বিভাগের চিত্রও প্রায় একই রকম, যেখানে গড় সাফল্যের হার ৫ থেকে ৬ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।
উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষ সমান সমান, কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে কেন মাত্র ২০ শতাংশ৪৪, ৪৫, ৪৮ ও ৪৯তম বিসিএসের বিভাগওয়ারী আবেদন ও সুপারিশের পূর্ণাঙ্গ চিত্র—
৪৪তম বিসিএস: বিভাগওয়ারী আবেদন ও সুপারিশের চিত্র
বিভাগ আবেদনকারী সুপারিশপ্রাপ্ত (উত্তীর্ণ)
ঢাকা ৭১,৪৮০ ৩১৯ (১৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ)
রাজশাহী ৫২,৭২৯ ২৭৫ (১৬ দশমিক ৪১ শতাংশ)
চট্টগ্রাম ৬৪,২২২ ২৭৯ (১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ)
খুলনা ৫১,৮৬০ ২১১ (১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ)
বরিশাল ২২,৫৪৫ ১১৭ (৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ)
সিলেট ১০,৩৫৭ ৩৮ (২ দশমিক ২৭ শতাংশ)
রংপুর ৪৬,৯১০ ২৩৬ (১৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ)
ময়মনসিংহ ৩০,৬১৩ ২০১ (১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ)
মোট ৩,৫০,৭১৭ ১,৬৭৬
৪৫তম বিসিএস: বিভাগওয়ারী আবেদন ও সুপারিশের চিত্র
বিভাগ আবেদনকারী সুপারিশপ্রাপ্ত (উত্তীর্ণ)
ঢাকা ৬৮,৬৯৪ ৩৭৯ (২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ)
রাজশাহী ৫২,৮৮০ ২৭১ (১৫ দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ)
চট্টগ্রাম ৬১,১৯৩ ২৯১ (১৬ দশমিক ১০ শতাংশ)
খুলনা ৫০,৮৯০ ২২৯ (১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ)
বরিশাল ২৩,১১৬ ১০২ (৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ)
সিলেট ৯,৫৭৪ ৫৭ (৩ দশমিক ১৫ শতাংশ)
রংপুর ৪৯,৯০২ ২৪২ (১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ)
ময়মনসিংহ ৩০,৬৭৩ ২৩৬ (১৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ)
মোট ৩,৪৬,৯২২ ১,৮০৭
৪৮তম (বিশেষ) বিসিএস: বিভাগওয়ারী আবেদন ও সুপারিশের চিত্র
বিভাগ আবেদনকারী সুপারিশপ্রাপ্ত (উত্তীর্ণ)
ঢাকা ১০,৭২০ ৭২৭ (২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ)
রাজশাহী ৬,৫২৭ ৫৫৭ (১৫ দশমিক ৯১ শতাংশ)
চট্টগ্রাম ৮,৫০২ ৭৭৮ (২২ দশমিক ২৩ শতাংশ)
খুলনা ৫,১০৩ ৪৬০ (১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ)
বরিশাল ১,৯৪৬ ২০৬ (৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ)
সিলেট ১,৩৭৩ ১১১ (৩ দশমিক ১৭ শতাংশ)
রংপুর ৪,০০১ ৩৬৩ (১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ)
ময়মনসিংহ ২,৮৫৩ ২৯৮ (৮ দশমিক ৫১ শতাংশ)
মোট ৪১,০২৫ ৩,৫০০
৪৯তম (বিশেষ) বিসিএস: বিভাগওয়ারী আবেদন ও সুপারিশের চিত্র
বিভাগ আবেদনকারী সুপারিশপ্রাপ্ত (উত্তীর্ণ)
ঢাকা ৫৬,৫৮১ ১৪০ (২০ দশমিক ৯৬ শতাংশ)
রাজশাহী ৫০,৯৮৪ ৯৭ (১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ)
চট্টগ্রাম ৫১,৬৭৪ ১২৩ (১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ)
খুলনা ৪৫,৭১৮ ৮৬ (১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ)
বরিশাল ২০,৪৩৭ ৩৭ (৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ)
সিলেট ৮,০১৭ ২৩ (৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ)
রংপুর ৪৯,২৭২ ৮৮ (১৩ দশমিক ১৭ শতাংশ)
ময়মনসিংহ ৩০,০৬৯ ৭৪ (১১ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ)
মোট ৩,১২,৭৫২ ৬৬৮
কেন এই পার্থক্য—
ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বিভাগ থেকে সাফল্য বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো এখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ও প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ–সুবিধা বেশি। তবে আবেদনের বিপরীতে সাফল্যের শতাংশ হিসাব করলে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের প্রার্থীরা অনেক বিসিএসেই ভালো করছেন। এর কারণ হিসেবে ধরা হয়, এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা বেশি।
তবে এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিসিএসে কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকাকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে মানতে নারাজ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারি না বিসিএসে কোন বিভাগ এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে আছে। কারণ, ঢাকা বিভাগ সুপারিশে এগিয়ে থাকলেও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে এখানকার জনসংখ্যা বরিশাল কিংবা সিলেট বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি।’
পুলিশে এএসআই নিয়োগে আবেদন শুরু, যা কিছু জানা জরুরিঅধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ আরও বলেন, ‘আমরা যদি জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানটা পেতাম, তাহলে পিছিয়ে থাকার আসল কারণগুলো স্পষ্ট হতো। যেমন নদীবিধৌত কুড়িগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা এখনো অনুন্নত, চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার সুযোগও কম। এমন জেলাভিত্তিক তথ্য হাতে পেলে আমাদের বিচার–বিশ্লেষণের পরিধি আরও বাড়ত।’
ঢাকা বিভাগের প্রার্থীদের আধিপত্য প্রসঙ্গে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইনের একটি পর্যবেক্ষণ মনে করিয়ে দিয়ে তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘সা’দত হুসাইনের একটি বিশ্লেষণ ছিল—ঢাকার নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন নটর ডেম বা হলিক্রসের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেয় বলে তারা বিসিএসে কম অংশ নেয়। ফলে এই শূন্যস্থানে ঢাকার বাইরের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভালো করার সুযোগ পায়।’
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সিলেট ও বরিশাল বিভাগ বিসিএস আবেদনের দৌড়ে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওই অঞ্চলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে বিসিএসের পরিবর্তে প্রবাসে যাওয়া কিংবা বাণিজ্যিক পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকতে পারে। তবে পিএসসির এই বিভাগওয়ারী তথ্যগুলো দেশের সুষম মেধা বিকাশ ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।
ব্র্যাকের মেধাবিকাশ বৃত্তিতে আবেদনের সময় বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীরা মাসে পাবেন ৮,০০০ টাকা