গারো পাহাড়ের ঢালে দিগন্তজোড়া ধানখেত, বন্য হাতির আক্রমণের শঙ্কায় কৃষকেরা

· Prothom Alo

শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন দিগন্তজোড়া সবুজের মুগ্ধতা। চোখ যত দূর যায়, তত দূর ধানের খেত—কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হালকা সবুজ, আবার কোথাও সোনালি আভা। যেন পাহাড়ের ঢালে প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে নকশিকাঁথার মতো ফসলি জমির এক অপূর্ব দৃশ্য। তবে ভালো ফলনের আশায় থাকা কৃষকদের মনে আনন্দের পাশাপাশি আছে বন্য হাতির আক্রমণের শঙ্কা।

গতকাল শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক ধরে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—কণঝুড়া, হালচাটি, ঝুলগাঁও, বালিজুরি, বাবলাকুনা, খাড়ামুরা, বড়গজনী, তাওয়াকুচা, রাংটিয়া, গোমড়া, সমশ্চুড়া, পোড়াবাড়ি, বারোমারি, দাওধারা-কাটাবাড়ি, তারানি, পানিহাটাসহ নানা এলাকায় ধানের সমারোহ। কোথাও ধানে থোড় এসেছে, কোথাও ফুল ফুটেছে, আবার কোথাও ধান পাকার অপেক্ষায়। দূর থেকে এসব খেতকে নকশিকাঁথার মতোই মনে হয়। সবুজ ধানের খেত ঘিরে গ্রামগুলো যেন পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি টিলার পাশে। সকালে অনেক কৃষককে খেতের আল ধরে ধানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে।

Visit catcross.org for more information.

শ্রীবরদীর হালচাটি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ধান এইবার ভালো হইছে, সময়মতো বৃষ্টিও হইছে। কিন্তু ধান কাটতে আর ২৫-৩০ দিন লাগবে। পাহাড়ে হাতি থাকায় ফসল ঘরে তোলা নিয়েই চিন্তা।’ তবে তিনি জানান, এই ভয় নতুন নয়, প্রতিবছর ধান পাকলেই এই দুশ্চিন্তা শুরু হয়।

একই চিত্র পুরো সীমান্তজুড়েই। শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর বিভিন্ন ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ধানের খেত এখন সবুজে ভরা। কোথাও ধান পাকার পথে, কোথাও ফুল এসেছে। কৃষকদের ধারণা, ধান কাটতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগবে।

গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন দিগন্তজোড়া সবুজের মুগ্ধতা। গতকাল শনিবার দুপুরে ঝিনাইগাতী উপজেলার বড় গজনী গ্রামে

ঝিনাইগাতীর নয়া রাংটিয়া গ্রামের কিষানি শ্যামলী মারাক বলেন, ‘বাতাসে ধানের শীষ দোলে—দেখে মন ভরে যায়। অনেক কষ্ট করে এই ফসল ফলাইছি। কিন্তু হাতির ভয়ে ফসল ঘরে তুলতে পারব কি না, সেই চিন্তায় আছি।’

বন বিভাগের গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে একটি হাতির দল তাওয়াকুচা-গজনী এলাকায় অবস্থান করছে। সন্ধ্যার পর এরা লোকালয়ে নেমে আসে। হাতিগুলোকে বনে ফেরাতে গ্রামবাসী, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম ও বন বিভাগের সদস্যরা কাজ করছেন।

নালিতাবাড়ীর তারানি গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় এবার চমৎকার ফলন হয়েছে। কিন্তু ধান পাকলেই হাতির দল মাঠে নেমে আসে। সব ধরনের দুর্যোগ সহ্য করেও আমরা ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখি।’

জেলা বন বিভাগ ও কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ৮ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীবরদীতে ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর, ঝিনাইগাতীতে ২ হাজার ২৪০ হেক্টর এবং নালিতাবাড়ীতে ২ হাজার ১১৬ হেক্টর জমি আছে। প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান থোড় অবস্থায়, ১৫ শতাংশে ফুল এসেছে এবং অধিকাংশ জমির ধান এখন পুষ্ট।

বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া বলেন, সারা বছর শতাধিক হাতি তিন-চারটি দলে বিভক্ত হয়ে গারো পাহাড়ে খাদ্যের সন্ধানে ঘোরে। তবে ধান ও কাঁঠাল পাকার সময় তারা লোকালয়ে নেমে আসে এবং ফসলে হানা দেয়। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং হাতির ক্ষতি যাতে কেউ না করেন, সে বিষয়ে সতর্কতা রাখা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে সেচের কারণে চাষ কিছুটা দেরিতে হয়। ধান কাটতে আরও কিছু সময় লাগবে। তবে ধান পাকলেই হাতির কারণে কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।

Read at source