আমার নানাবাড়ি
· Prothom Alo

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
গত প্রায় চার দশক নানাবাড়ি যাওয়া হয়নি। ভাবলাম, শৈশব–কৈশোরের স্বপ্নের বাড়িটা একবার ঘুরে আসি। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার একাই চলে গেলাম সেখানে। যাওয়ার আগের দিন বড় নাতি তানজিফকে বললাম, ‘নানাভাইয়া, আমি আগামীকাল আমার নানাবাড়ি যাব।’ আমার ১২ বছরের নাতি অবাক বিস্ময়ে ভাবল, নানাভাইয়ারও আবার নানাবাড়ি আছে!
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
প্রধান সড়ক থেকে নানাবাড়িতে ঢোকার পুরোনো নিজস্ব রাস্তাটি এখন আর নেই। গলির মতো রাস্তা দিয়ে ঢুকতে হয়।
ঢুকতেই নতুন বিশাল মসজিদটি চোখে পড়ল। আমাদের শ্রদ্ধেয় আবু মামাসহ অন্য মামারা বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজন মাথায় রেখে পুরোনোটি ভেঙে এটি নির্মাণ করেছেন। এ জন্য তাঁরা ধন্যবাদ পাবেন। তারপরও মামাতো ভাই হিমু আর আমার মনে হচ্ছিল, পুরোনো মসজিদটি না ভেঙে চারপাশে পিলার তুলে দুই পাশে নতুন সিঁড়ি যুক্ত করে সেটিকে ওপরের দিকে সম্প্রসারিত করা যেত না?
উঠানে পা রাখতেই দেখলাম, বড় উঠানটি তার নিজস্বতা হারিয়েছে আয়তনে ও অবয়বে। কংক্রিটের উঠানে মাটির ঘ্রাণ নেই। চারপাশের পুরোনো ঘর ভেঙে নানান রঙের ইমারত নির্মিত হয়েছে। ওই বিশাল উঠানে গরুর লেজ ধরে ঘুরে ঘুরে বহুদিন বহু সন্ধ্যা ধানমাড়াই করেছি।
নৌকায় চড়ে মায়ের সঙ্গে যে খাল ধরে নানাবাড়ি যেতাম, সেটি আজ মৃতপ্রায়। নৌকা চালানোর সময় বইঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের কোনো ছন্দপতন হতো না। নৌকা কিছুটা দুলত। ঘুম ঘুম চোখে নৌকা ঘাটে ভিড়লে মনে হতো, আমার চেয়ে সুখী আর কে আছে।
অতি প্রিয় বড় মামা যেদিন অন্যদের সঙ্গে মেঝের ওপর হাত-পা চেপে ধরে হাজামকে বাঁশের ছুরি চালিয়ে আমার সুন্নতে খতনার ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন, সেদিন বড্ড অভিমান হয়েছিল।
প্রায় সমবয়সী ছোট মামা তাঁরই পৈতৃক নিবাসে আমার দাপট মেনে নিতে পারতেন না। আমিও ভাবতাম, আমার নানাবাড়িতে তুমি কে হে!
নানা-নানি একে অপরকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন। সালাম বিনিময় করতেন। এখন ভাবি, পুনজ৴ন্ম হলে ওই জগতে যদি ফেরা যেত!
সেজ নানার বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়ের গাছেরা ছিল আমার শিক্ষার্থী। ওদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতাম। ওদের শান্ত ও নিশ্চল অবস্থা আমার ক্ষণিকের শিক্ষকতাকে ভীষণ উপভোগ্য করে তুলত।
আব্বার কর্মস্থল ঝিনাইদহ থেকে বড্ডা আব্বাকে (নানার আব্বা) ‘পাকজনাবেষু’ ও ‘কদমবুসি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে একটি পত্র লিখেছিলাম। বড্ডা আব্বা পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। আমার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে সবাইকে ডেকে ডেকে নাকি সে পত্র পড়ে শুনিয়েছিলেন। নানাবাড়ির বহু স্মৃতি মুছে গেলেও বড্ডা আব্বার খড়মের আওয়াজ আজও কানে বাজে।
ওই দিন দুপুরের পর শিশু-কিশোরদের জন্য বরই উৎসবের ব্যবস্থা করা হলো। শুরুতে কয়েকজন এলেও ওদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস বাঁশির শব্দের মতো ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। বোনেরা, মায়েরা অনেকেই বেরিয়ে এলেন। মুহূর্তেই ৩৪ কেজি কুলবরই শেষ হয়ে গেল। আমি আমার শৈশব-কৈশোরকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছুঁয়ে দেখতে পারলাম।
আমার পক্ষ থেকে মামাতো ভাই লাবু ও তার স্ত্রী পিয়া সবার জন্য সামান্য ইফতারির আয়োজন করেছিল। আমি মসজিদ–সংলগ্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ইফতার করলাম।
অনেক পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও আতিথেয়তার বিষয়টি অটুট রয়েছে দেখে ভালো লাগল।
পরদিন ফজরের নামাজ আদায় করে বিদায় নেওয়ার সময় মামিমা মামাতো বোন মিতুর তৈরি অনেকগুলো প্রজাপতি, ফুল ও পাখি অঙ্কিত পিঠা দিলেন। মনে হলো মিতুর ভেতর নানি আম্মা বেঁচে আছেন। শীতের কুয়াশায় তখনো চারপাশে কিছুটা অন্ধকার। গাড়ির সামনের কাচ বারবার ভিজে যাচ্ছিল। আমার চোখের জলের স্রোতে বাঁধ দিয়ে রেখেছিলাম। একই কাজ করেছিলাম বড্ডা আব্বা (পণ্ডিত আবদুল আজিজ) ও সব স্বজনের কবর জিয়ারতের সময়।
আমার প্রবল আগ্রহ সত্ত্বেও আমার দুই নাতির জন্য নানাবাড়ির আবহ তৈরি করতে পারিনি। তবে আমার প্রার্থনা—সব শিশুর মনোজগতে একটি নানাবাড়ি থাকুক।
জি, আমার নানাবাড়ির ঠিকানা: হন্ডিত (পণ্ডিত) বাড়ি, বেজারগাঁ (ব্রজেরগাঁও), আঁহশ্যাআড়া (আমিশাপাড়া), হোনামুড়ী (সোনাইমুড়ী), নোয়াখালী।
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়