বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাবনা- ২

· Prothom Alo

ক্যানসার মানেই যেন মৃত্যুভয়! প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ অকালে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঘাতক ব্যাধির ছোবলে। কিন্তু এই ক্যানসার কোনো আধুনিক যুগের রোগ নয়? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ১৭ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে ক্যানসারের অস্তিত্ব ছিল! এত প্রাচীন একটি রোগকে আমরা আজও কেন পুরোপুরি বশে আনতে পারলাম না? সর্বোপরি, কীভাবে দৈনন্দিন ছোট ছোট সতর্কতা আমাদের এই মৃত্যুর ফাঁদ থেকে বাঁচাতে পারে?

ক্যানসার সৃষ্টির প্রধান কারণ ও কার্সিনোজেন

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, ডিএনএ নামে অদ্ভুত এক দ্বিসূত্রক অণুতেই নিহিত রয়েছে আমাদের জীবনের গল্প। এখান থেকেই নির্দেশনা দেওয়া হয়, কীভাবে আমাদের দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

Visit afnews.co.za for more information.

তাই ক্যানসারের মতো জটিল সমস্যার জট খুলতে পারে এই ডিএনএ। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, আমাদের কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী জিনগুলোতে সমস্যা হলেই দেখা দেয় ক্যানসার। আরও গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেল, বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ দায়ী। সেগুলো আমাদের ডিএনএকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ধরনের রাসায়নিকের নাম দেওয়া হলো কার্সিনোজেন বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ। তবে কার্সিনোজেন যে শুধু নিকোটিনের মতো রাসায়নিকেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। এটি বিকিরণের মতো ভৌত কোনো বস্তু কিংবা ভাইরাসের মতো জৈব বস্তুও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমাদের কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী জিনগুলোতে সমস্যা হলেই দেখা দেয় ক্যানসার

ধূমপানের সময় গ্রহণ করা নিকোটিন, ভূগর্ভস্থ পানিতে থাকা আর্সেনিক, কৃত্রিমভাবে ফল পাকাতে ব্যবহৃত ইথিলিন অক্সাইড এবং ফরমালিনের মতো প্রিজারভেটিভকে রাসায়নিক কার্সিনোজেনের কাতারে ফেলা যায়। এসব রাসায়নিক আমাদের ডিএনএতে নেতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমে মানবদেহে ক্যানসারের সূত্রপাত করে।

বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা - ১
কার্সিনোজেন যে শুধু নিকোটিনের মতো রাসায়নিকেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। এটি বিকিরণের মতো ভৌত কোনো বস্তু কিংবা ভাইরাসের মতো জৈব বস্তুও হতে পারে।

ফ্যামিলিয়াল ক্যানসার সিনড্রোম

মাঝেমধ্যে ক্যানসার জিনগতভাবে বংশপরম্পরায় ছড়ায়। এর সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:

  • খুব অল্প বয়সেই এর সূত্রপাত ঘটে

  • রোগীর নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্তের ইতিহাস থাকে

  • আপন ভাইবোনদের ভেতর আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি

  • বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিন মিউটেশন বেশি ঘটে

  • পলিমরফিজম এদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।

স্তন, ডিম্বাশয়, প্যানক্রিয়াস, খাদ্যনালির ক্যানসার এবং রেটিনোব্লাস্টোমা, ভন হিপ্পেল লিনডাউ সিনড্রোম প্রভৃতিকে আমরা ফ্যামিলিয়াল ক্যানসার সিনড্রোমের ভেতর ফেলতে পারি। শিশুদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন বয়সে লিউকেমিয়া, ব্রেন টিউমার, লিম্ফোমা বা উইলমস টিউমারের মতো মারাত্মক ক্যানসারের প্রবণতা দেখা যায়।

ক্যানসার সৃষ্টিতে ভূমিকা আছে অতিবেগুনি বিকিরণেরও। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে সরাসরি আসতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ওজোন স্তরের ব্যাপক ক্ষতির কারণে এই রশ্মি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি

ক্যানসার সৃষ্টিতে ভাইরাসও পিছিয়ে নেই। হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস লিভার ক্যানসারের জন্য দায়ী। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কারণে মানুষ জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি (Helicobacter pylori)-এর মতো ব্যাকটেরিয়া আমাদের পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

ব্যায়াম করলেই কাবু হবে ক্যানসার!
শিশুদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন বয়সে লিউকেমিয়া, ব্রেন টিউমার, লিম্ফোমা বা উইলমস টিউমারের মতো মারাত্মক ক্যানসারের প্রবণতা দেখা যায়।

এইচআইভি বা এইডসে আক্রান্ত রোগীদের দেহে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে তাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার বাসা বাঁধতে পারে। যেমন ক্যাপোসিস সারকোমা, সারভাইক্যাল ক্যানসার, মলদ্বারের ক্যানসার এমনকি হজকিনস লিম্ফোমা এদের মধ্যে অন্যতম।

মানবদেহের যেকোনো বিভাজনক্ষম কোষেই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে পারে। রক্ত, হাড়, মূত্রনালি, স্তন, জরায়ু, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, ত্বক, অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, কোলনসহ মানবদেহের এমন কোনো অংশ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ, যার প্রাচীর ভেদ করে ক্যানসার আক্রমণ চালাতে পারে না।

মানবদেহের যেকোনো বিভাজনক্ষম কোষেই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে পারে

প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া ছিল। সত্তর দশকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যন্ত্রপাতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ফলে ক্যানসার শনাক্তকরণ আরও সহজ হয়। আলট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ব্যবহার করে মানবদেহে লুকিয়ে থাকা জটিল থেকে জটিলতম ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

নতুন এই রক্ত পরীক্ষায় ক্যানসার ধরা পড়বে ১০ বছর আগে
রক্ত, হাড়, জরায়ু, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, ত্বক, অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, কোলনসহ মানবদেহের এমন কোনো অংশ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ, যার প্রাচীর ভেদ করে ক্যানসার আক্রমণ চালাতে পারে না।

টিউমার মার্কার হলো টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন এনজাইম, হরমোন বা জৈব পদার্থ। রক্তে এদের উপস্থিতি পাওয়া গেলে ক্যানসারের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এমনকি ক্যানসারের সফল চিকিৎসার পরও পুনরায় ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই মার্কারগুলো ব্যবহৃত হয়।

বিশ্বে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে মূলত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। পরিমিত মাত্রায় বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করতে পারলে ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়া অনেকটাই ঠেকানো যায়। তবে বিকিরণ প্রয়োগ করে ক্যানসার কোষকে মারার পাশাপাশি সাধারণ কোষও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই বিকল্প হিসেবে এখন নিত্যনতুন অনেক কেমোথেরাপিক ড্রাগের উত্থান হয়েছে।

যেমন, লিউকেমিয়া নামে ব্লাড ক্যানসার মোকাবিলা করার জন্য ব্যবহার করা হয় অ্যামিনোপটেরিন নামে একধরনের ওষুধ। এটি ক্যানসার আক্রান্ত রক্তকণিকাকে ফলিক অ্যাসিড গ্রহণে বাধা দেয়। এতে ক্যানসার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঠিকই, পাশাপাশি সাধারণ কোষও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই কেমোথেরাপি একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি এর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। প্রত্যেকটি ক্যানসার একে অপরের থেকে ভিন্ন। এদের প্যাথোফিজিওলজি, লক্ষণ এবং চিকিৎসার ধরনও ভিন্ন।

লেখক: চিকিৎসক ও বিজ্ঞান লেখক, মাগুরা সদর হাসপাতাল, মাগুরা।সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ডেভিডসনস ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, জার্নালস অব আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি, সিদ্ধার্থ মুখার্জি/দ্য এম্পারর অব অল ম্যালাডিজহার্টের ক্যানসার হয় না কেন

Read at source