ইসলাম, কর্তৃত্ববাদ ও অনুন্নয়ন

· Prothom Alo

আহমেত টি কুরু, ইসলাম, অথোরিটারিয়ানিজম, অ্যান্ড আন্ডারডেভেলপমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, জুন ২০১৯।।

Visit esporist.org for more information.

আহমেত টি কুরু তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের চিন্তার বাজারে অপরিচিত। যদিও তিনি জ্ঞানজগতের যে বিষয়গুলো নিয়ে হরদম আলাপ-আলোচনা করেন বা বহির্বিশ্বে যে কারণে তাঁর নামডাক, সেগুলো বাংলাদেশের বাজারেও খুব জনপ্রিয় ও চালু প্রসঙ্গ। তাঁর কাজের পরিধির মধ্যে রয়েছে সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক, মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রসমূহের হালচাল, রাজনৈতিক ইসলাম বা ইসলামপন্থা ইত্যাদি। কিন্তু ভৌগোলিক দিক থেকে দুনিয়ার যে অংশ তাঁর তত্ত্ব ও গবেষণার পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ, সেটা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্ক। সম্ভবত এ কারণেই তাঁর কাজ এদিকে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। এটাও ঠিক, আজকে এখানে কুরুর যে বই নিয়ে আলোচনা, কিছুদিন পূর্বে এর বাংলা তরজমা প্রকাশিত হয়েছে। কুরু মার্কিন দেশে সান দিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক।  ২০০৯ সালে প্রকাশিত সেক্যুলারিজম অ্যান্ড স্টেট পলিসিজ টুওয়ার্ড রিলিজিয়ন: দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ফ্রান্স, অ্যান্ড টার্কি বইয়ে তিনি সেক্যুলারিজমের দুটি রূপ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন: একটা হচ্ছে অ্যাসারটিভ সেক্যুলারিজম বা কঠোর সেক্যুলারিজম, অন্যটি হচ্ছে প্যাসিভ সেক্যুলারিজম বা কোমল সেক্যুলারিজম।

কঠোর সেক্যুলারিজম হলো যেখানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক জনপরিসর থেকে ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতীককে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে, কোমল সেক্যুলারিজমে ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতীককে দূরে না সরিয়ে উল্টো রাষ্ট্র একধরনের নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও তুরস্কের উদাহরণ টেনে কুরু দেখিয়েছেন, কোন রাষ্ট্র ধর্মকে কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা নির্ধারিত হয় সেই রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ সেক্যুলারিজমের কোনো সর্বজনীন ছক নেই, যা সব সমাজে একইভাবে প্রযোজ্য; বরং প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব ইতিহাসই তার সেক্যুলারিজমের ধরন ও কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ইসলাম, অথোরিটারিয়ানিজম, অ্যান্ড আন্ডারডেভেলপমেন্ট: আ গ্লোবাল অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল কমপ্যারিজন বইটি। আমাদের আলোচনা এ বইকে ঘিরে।

বইয়ের শিরোনাম থেকেই লেখকের মূল প্রশ্নটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। সমসাময়িক দুনিয়ার নানা পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মুসলমান রাষ্ট্রগুলো অথবা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ধর্মাবলম্বী নানাবিধ সহিংসতায় মুখর, সেখানে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার জয়জয়কার চলছে। পাশাপাশি যেসব সূচকে সাধারণ উন্নত দেশ বলে ধরে নেওয়া হয়, যেমন মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, সাক্ষরতার হার, গড় আয়ু—সব কটিতে এসব দেশ বেশ তলানিতে। ফলে একেবারে খোলা চোখে যে হালত দেখা যাচ্ছে, এটাই তাঁর প্রশ্ন: মুসলিমপ্রধান দেশগুলো কেন তুলনামূলকভাবে কম শান্তিপূর্ণ, কম গণতান্ত্রিক এবং কম উন্নত?

কুরু এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক দুনিয়ার বাস্তবতায়। সেখান থেকে তাঁর আলাপ আসলে মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে রয়েছে সমসাময়িক দুনিয়ার হালচাল এবং দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ঐতিহাসিক তুলনা। কেন এভাবে ভাগ করলেন, সেটা বোঝা যাবে তিনি আসলে কোন কোন অবস্থানকে মোকাবিলা করছেন, সেটা দিয়ে। আমরা এখানে আলোচনা করব উল্টোভাবে। প্রথমে তাঁর বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ, মানে ইতিহাসের অংশটা দেখব। অতঃপর আসব প্রথম ভাগে।

কুরু যে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন, এর সাধারণত দুটি প্রচলিত ও জনপ্রিয় উত্তর রয়েছে। একটা হচ্ছে প্রাচ্যবাদী ধারণা। এতে মনে করা হয়, এই যে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা, অগণতান্ত্রিক পরিবেশ—এগুলো ‘ইসলাম’ ধর্মের মধ্যেই নিহিত। অর্থাৎ খোদ ইসলাম ধর্মের মধ্যেই এক ধরনের অগণতান্ত্রিক উপাদান রয়েছে; ইসলাম জ্ঞান–বিজ্ঞানবিরোধী এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয় উত্তর অনেকটা উত্তর-উপনিবেশবাদী। এতে দাবি করা হয় যে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা মুসলমান দেশগুলোর স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করেছে, কর্তৃত্ববাদ ও সহিংসতার বীজ বুনে দিয়েছে।

কুরু আসলে এই চালু মত দুটির পক্ষে অবস্থান নিতে পারেননি। প্রথমত, তিনি দেখছেন এবং দেখাচ্ছেনও যে সেই অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কাল পর্যন্ত মুসলিম সমাজে প্রচুর দার্শনিক, চিন্তক ও পণ্ডিত জন্ম নিচ্ছেন। সে সময়ে মুসলিম সমাজগুলোর দার্শনিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে তিনি পরবর্তী পশ্চিম ইউরোপের রেনেসাঁর কালের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। বরং সেকালে পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় মুসলিম সমাজগুলো ভালো হালতে ছিল। একদিকে আল-ফারাবি, আল-বেরুনি, ইবনে সিনার মতো বিশ্বসেরা ‘পলিম্যাথ’দের আবির্ভাব ঘটছে, অন্যদিকে আন্তমহাদেশীয় বাণিজ্যে তারা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এই ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা ধরে তিনি প্রথম প্রশ্নের জবাব দেন। অর্থাৎ ইসলাম প্রগতি, বিজ্ঞান বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে ধোপে টেকে না।

দ্বিতীয়ত, কুরু দেখাচ্ছেন, একাদশ ও দ্বাদশ শতক থেকেই মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে তুলনামূলক বৈজ্ঞানিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্তরে একটি বিপরীতমুখী পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পশ্চিম ইউরোপ যখন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন মুসলিম দুনিয়া ধীরে ধীরে ‘স্থবির’ অবস্থার দিকে চলে যাচ্ছিল। এই যে বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া, মানে পশ্চিম ইউরোপ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, মুসলিম দুনিয়া তখন কেন উল্টোদিকে হাঁটছে, এমন একটা প্রশ্ন পুরো বইয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নানাভাবে এ প্রশ্নটিকেই মোকাবিলা করার চেষ্টা করে গেছেন কুরু।

উপনিবেশবাদ ও উপনিবেশায়ন নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বকে ভয়ানক ভাঙচুর করে গেছে। কিন্তু কুরুর মতে, ব্যাপক হারে পশ্চিমা উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মুসলমান সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। অর্থাৎ উপনিবেশের ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু একে কেবলই উপনিবেশায়নের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কেননা স্থবিরতা শুরু হয়েছিল তারও আগে। তাই তিনি দাবি করেন যে মুসলমান দেশগুলোর রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সমস্যাগুলোকে বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক কারণ খোঁজা দরকার, যেন এই প্রাথমিক জমানার গতিশীলতা এবং পরবর্তী স্থবিরতার মধ্যবর্তীকালকে আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝা যায়।

এই প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে কুরু কোন রাস্তায় হাঁটেন? মানে তাঁর প্রস্তাব কী? তিনি সমস্যার উত্তর খোঁজেন ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’-এর মধ্যে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের সঙ্গে উলামাদের আঁতাতমূলক সম্পর্ক আসলে মুসলিম দুনিয়াকে ধীরে ধীরে স্থবির করে দিয়েছিল এবং সমসাময়িক দুনিয়াতেও এর এক ধরনের প্রভাব বা রেশ রয়ে গেছে বলা যায়। এটা এখন নতুন আকারে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর প্রস্তাবকে তিনি দুইভাবে হাজির করেন। প্রথমত, ইতিহাস থেকে, মানে ঐতিহাসিক কোন কালে এবং কোন পটভূমিতে এই আঁতাত গড়ে উঠেছিল এবং কোন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর বিকাশ ঘটেছিল, সেটা তিনি তুলে ধরেন। দ্বিতীয়ত, সমসাময়িক দুনিয়াতে এটা কোন রূপে ও কীভাবে টিকে আছে, তা দেখান।

অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনায় যাওয়ার আগে সংক্ষেপে এই উলামা-রাষ্ট্র জোটের উদ্ভবের ইতিহাস ও কুরুর মূল যুক্তি তুলে ধরা যাক। ইসলামের প্রাথমিক জমানায় ইসলামি পণ্ডিত বা উলামা বা বুজুর্গরা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এটাকে তাঁরা কলুষিত হওয়ার পথ ভাবতেন। বরং তাঁদের সম্পর্ক ছিল বণিকদের সঙ্গে, বাণিজ্য থেকে তাঁরা আর্থিক প্রণোদনা পেতেন। কুরু দেখান যে অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৭২.৫ শতাংশ ইসলামি পণ্ডিত বা তাঁদের পরিবার বাণিজ্য বা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে দূরত্ব রাখার এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে। উমাইয়ারা নবীজির বংশধরদের নিপীড়ন এবং সব ধরণের বিরোধী মহলকে সহিংস কায়দায় দমন করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ক্ষমতার এই সহিংস চরিত্র উলামা ও দার্শনিকদের মনে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করেছিল। আব্বাসীয়দের আমলে এটা আরও দৃঢ় হয়। ফলে এটা মোটেও অবাক করার মতো বিষয় নয় যে সুন্নি ফিকাহ শাস্ত্রের চার মাজহাবের প্রধানই সরকার বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন অনেকটা স্বাধীনচেতা বুজুর্গ। উল্টো ভিন্নমতের কারণে তাঁদের কারারুদ্ধ ও নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। শিয়া ধর্মীয় নেতারাও রাজনৈতিক নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন।

আহমেত কুরুর মতে, ইসলামের প্রাথমিক জমানায় পণ্ডিত ও বুজুর্গদের এই স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল বণিকদের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে। প্রায় সব মহলের দার্শনিকদের মধ্যেই এর প্রভাব টের পাওয়া যেত। তবে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ থেকে তাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও, কুরুর মতে, তখন পর্যন্ত দর্শনকে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না। অথবা রাষ্ট্রপ্রণোদিত কোনো চিন্তাস্কুল ছিল না। ফলে তখনো এই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা ক্ষতিকারক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই পরিস্থিতি পাল্টে যায় একাদশ শতকে এসে। এই শতকে এশিয়া, বিশেষ করে ইরান, ইরাক বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। উত্তর আফ্রিকা, মিসর ও সিরিয়ার দিকে শিয়া রাজ্যের উত্থানে আব্বাসীয় খেলাফত মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তখন সুন্নিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার রাজনৈতিক আহ্বান আসে। সুন্নিদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য দুজন আব্বাসীয় খলিফা একটি ‘সুন্নি ধর্মতন্ত্র [ক্রিড]’ ঘোষণা করেন। যাঁরাই এর বিরোধিতা করেন, তাঁদের ধর্মত্যাগী বলে ঘোষণা করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখে পড়তে হয়। এই প্রক্রিয়া সুন্নি সামরিক রাষ্ট্রের উত্থান ঘনিয়ে আনে। এর পর সেলজুক সাম্রাজ্য (১০৪০-১১৯৪) শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।

সেলজুকরা কৃষিখাত, তথা সামগ্রিক অর্থনীতি সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্দেশ্যে ‘ইকতা’ প্রথা চালু করেন। এটি বণিকদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান দুর্বল করে দিয়েছিল। ফলে যে বণিকেরা আগে উলামা ও দার্শনিকদের অর্থায়ন করতেন—অন্যভাবে বলতে গেলে, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে রেহাই পেতে যাঁরা নিয়ামক ছিলেন—তাঁদের সক্ষমতায় আঘাত পড়ে। বিভিন্ন বিরোধী দার্শনিক মতবাদকে মোকাবিলা করার জন্য রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ‘নিজামিয়া’ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করল। দেখা গেল, উলামাদের সঙ্গে বণিকদের সম্পর্ক শুধু দুর্বলই হলো না, উল্টো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সেটি শক্তিশালী হয়ে উঠল। দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত উলামাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের এমন জোটের সেলজুক মডেল অন্যান্য দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ক্রুসেডার ও মোঙ্গল আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ এই জোটের বিস্তারের পালে হাওয়া দিয়েছিল। কেননা ভিনদেশি আক্রমণের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল ও অস্থিরতার প্রতিক্রিয়াতে উলামা ও দার্শনিকেরা আরও বেশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন। এটি ইসলামী সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়। ষোড়শ শতকের দিকে সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী সাম্রাজ্য থাকলেও—বলকান থেকে বাংলা পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলেও—এগুলো প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, এগুলো একদিকে যেমন বণিকদের প্রান্তিক করেছিল, তেমনি দার্শনিকদের জন্য প্রতিকূল ছিল।

এশিয়ায় অনেক ধরনের মুসলিম রাষ্ট্র ছিল, যেখানে সেই উলামা-রাষ্ট্র জোট ছিল না এবং সেগুলো বণিকবান্ধব ছিল। কিন্তু এগুলো মুসলিম দুনিয়ায় কোনো বিকল্প মডেল দিতে পারেনি। কুরুর মতে, এটা হয়নি, দুটো কারণে। এক, সেসব অঞ্চলে ইসলাম মাত্রই প্রবেশ করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই স্থানিক প্রথা ও রীতিনীতির সঙ্গে তাকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পথ চলতে হচ্ছিল। দুই, এসব অঞ্চল কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপীয় উপনিবেশায়নের কবলে পড়ে; ইসলামীকরণ ও উপনিবেশায়নের মধ্যবর্তী কাল সেখানে এত ছোট ছিল যে সেটা কোনো দীর্ঘ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি।

এই হচ্ছে উলামা-রাষ্ট্র জোটের উদ্ভবের ঐতিহাসিক দিক ও কারণ। অর্থাৎ, কুরুর উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াকে মূল কারণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর অভিমত হচ্ছে, পতনোন্মুখ পরিস্থিতিতে উপনিবেশায়ন এসে এসব সমাজে শেষ ধাক্কা দিয়েছে। মুসলমান সমাজে যে রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল বা হচ্ছিল, সেটাকে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ আরও তীব্র ও দীর্ঘায়িত করে তোলে। তিনি যখন মুসলিম বিশ্বের পতনোন্মুখ পরিস্থিতিকে আমলে নিচ্ছেন, তখন এটাকে তুলনা করছিলেন পশ্চিম ইউরোপের অগ্রগতির সঙ্গে। তিনি অষ্টম-নবম শতকে মুসলিম দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিস্থিতির সঙ্গে রেনেসাঁর আমলে পশ্চিম ইউরোপের মিল খুঁজে পান। কিন্তু একাদশ শতকে যখন উলামা-রাষ্ট্র জোট তৈরি হচ্ছিল, মুসলিম বিশ্ব যখন বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক গতিবেগ হারাচ্ছিল, তখন পশ্চিম ইউরোপে, কুরুর মতে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমত, ক্যাথলিক চার্চ ও রাজকীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দিতে শুরু করে এবং সেই বিচ্ছেদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে হাজির করার চেষ্টা করা হয়। এটা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য রাখতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাখতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করলে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিস্থিতিও পরিবর্তন হতে থাকে, বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়। তৃতীয়ত, বণিক শ্রেণি বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। ফলে, কুরুর মতে, ‘ধর্মীয়, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অর্থনৈতিক শ্রেণির মধ্যকার এই নতুন সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত রেনেসাঁ, মুদ্রণবিপ্লব, ভৌগোলিক অনুসন্ধান, প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লব এবং শিল্পবিপ্লবের মতো বিভিন্ন প্রগতিশীল প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ পশ্চিম ইউরোপ তার এক সময়ের শ্রেষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম বিশ্ব ও চীনকে ছাড়িয়ে যায়।’ (পৃ. ৫)

ঐতিহাসিক এই পুরো প্রক্রিয়াকে কুরু বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের চারটি অধ্যায়ে বিশদভাবে তুলে ধরেন। চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য এবং এর মূলে থাকা কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণগুলো আলোচনা করেন। কুরু এই অধ্যায়ে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী যুক্তিকে মোকাবিলা করেছেন। এর একটি এই দাবি করে যে মুসলিম শাসনাধীন অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক গতিশীলতা ছিল মূলত অমুসলিমদের অবদান, তাই এর কৃতিত্ব ইসলামকে দেওয়া যায় না। ইসলাম ও বিজ্ঞান পরস্পরবিরোধী—ইত্যাকার যেসব দাবি হাল আমলে আমরা শুনতে পাই, এটা অনেকটা সে রকমই। অন্য দাবিটি আবার মুদ্রার ঠিক আরেক পিঠ। মুসলমানরা তাদের প্রাথমিক জমানায় যে সাফল্য অর্জন করেছিল, সেটা ইসলামকে সঠিকভাবে অনুসরণ করার কারণেই। এই দাবিও বর্তমান জমানার ইসলামপন্থীদের খুব চিরচেনা একটা যুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত—ইসলাম থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণেই এই অবদমন এবং ইসলামের আওতার ভেতরেই সবকিছুর সমাধান।

কুরু এই দুই প্রশ্নের মোকাবিলা করেন। তিনি দেখান, ‘মুসলমানরা তাদের পূর্বসূরি এবং সমসাময়িক অমুসলিমদের অবদানকে গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্ভাবনের মাধ্যমেই একটি প্রগতিশীল সভ্যতা গড়ে তুলেছিল।’ পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, সে সময় মুসলিম ভূখণ্ডগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি ‘ইতিবাচক চক্র’ গড়ে তুলেছিল। পরবর্তী শতাব্দীগুলোর তুলনায় অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উলামা ও দার্শনিকেরা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন এবং সেই স্বাধীনতার ওপর জোর দিতেন। জীবন ও জীবিকার জন্য উলামারা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতেন না। সে সময়ের উলামাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে মুনির-উদ দ্বীনের বরাতে কুরু লেখেন, ‘বিপুলসংখ্যক উলামা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানা যায়। সরকারি চাপ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতেই উলামারা প্রধানত এটি করেছিলেন।’ কোনো কোনো উলামা তো ঘোষণাই দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ। এমনকি সে সময়ের উলামারা সাধারণত শাসকদের সান্নিধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ‘জ্ঞানের বিষয়ে’ অনির্ভরযোগ্য এবং তাঁদের বর্ণিত হাদিসের ক্ষেত্রেও অবিশ্বস্ত হিসেবে চিত্রিত করতেন। একইভাবে অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৯০০ উলামার জীবনী বিশ্লেষণ করেছিলেন হায়িম কোহেন। সেই বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত কুরু তুলে ধরেন, ‘সেই সময়ে উলামারা খ্রিষ্টান যাজকতন্ত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন। কারণ, বিচারক এবং অল্প কয়েকজন পণ্ডিত ছাড়া উলামারা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সক্ষমতায় কাজ করতেন; তাঁরা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা নিযুক্ত ছিলেন না…তাঁরা কোনো বেতন পেতেন না এবং নিজেদের ভরণপোষণ তাঁদের নিজেদেরই করতে হতো, যা তাঁরা বিভিন্ন উপায়ে করতেন।’

এটা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি আরেক দিকেও মনোযোগ দেন। ইসলামের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্রকে অবিচ্ছেদ্য সত্তা হিসেবে দেখানোর যে জনপ্রিয় রেওয়াজ এই জমানায় চলছে, এ ধারণাকেও তিনি প্রশ্ন করেছেন। আলাপের সামনে আমরা সেদিকে কিছুটা দেখব। আপাতত বলে রাখি, কুরু ঐতিহাসিকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, এই ধারণাও আদতে ঐতিহাসিক নির্মাণ, ইসলামের অপরিহার্য অংশ নয়।

কিন্তু কুরুর মতে, একাদশ শতকেই নেতিবাচক পরিস্থিতির উদ্ভব শুরু হয়। তিনি যে উলামা-রাষ্ট্র জোটের কথা বলেন, সেটা তৈরি হয়েছিল বিচিত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে। কৃষি খাত থেকে রাজস্ব কমে যাওয়ায় পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমি রাজস্ব বা ‘ইকতা’ প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত অর্থনীতির সামরিকীকরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ক্রমবর্ধমান সামরিকায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বণিকেরা তাঁদের পূর্বের ভূমিকা ও প্রভাব হারাতে শুরু করেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাওয়ার বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একদিকে এই অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে শিয়াদের শক্তিবৃদ্ধি—এ দুইয়ের প্রতিক্রিয়ায় নতুন সমীকরণ দেখা দেয়। কুরুর মতে, এই আর্থসামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিই উলামা-রাষ্ট্র জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। সেলজুক উলামা ও শাসকেরা একাদশ শতাব্দীর এই সংকটময় মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে যে জোট গঠন করেন, ‘নিজামিয়া’ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক। ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হতে শুরু করে। এই পুরো প্রক্রিয়া ও পরিস্থিতিতে, কুরুর মতে, ‘উলামা-রাষ্ট্র জোটের নির্ধারিত সীমানার বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণ এবং সৃজনশীলতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়।’ কুরু এই দায় কিছুটা ইমাম গাজ্জালির ওপরও বর্তান। একাদশ শতকের এই রূপান্তর পরবর্তী শতকে আরও সংহত হতে থাকে। এমন নয় যে এই সময়ে মুসলমানদের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক কাজ একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বরং ‘ক্ষমতার এই পরিবর্তিত অবস্থাই মুসলিম দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতার (যদি পতন না–ও হয়) দিকে নিয়ে গিয়েছিল’।

এরপরের অধ্যায়ে দ্বাদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যকার সংকটকালকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। মুসলিম দুনিয়া ও পশ্চিম ইউরোপ, দুটোই এখানে আলোচিত হয়। এই সময়ের মধ্যে মুসলিম দুনিয়া ক্রুসেডার, মোঙ্গল ও তৈমুরের বিধ্বংসী আক্রমণের শিকার হয়েছিল। এগুলো অনেক মুসলিম শহরে বাণিজ্যিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অবনতি ঘটিয়েছিল, বিশেষত মোঙ্গল আক্রমণগুলো অঞ্চলগুলোর সেচব্যবস্থা ধ্বংস করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছিল। যদিও ক্রুসেডারদের পরাজিত করে, মোঙ্গলদের ইসলামে দীক্ষিত করে এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠন করে ভূরাজনৈতিকভাবে মুসলিম দুনিয়া ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এই আক্রমণ, দখল, ধ্বংসযজ্ঞ অস্তিত্ব রক্ষা এবং শৃঙ্খলার জরুরতকে সামনে হাজির করে। এর ফলে কুরুর মতে, উলামা-রাষ্ট্রের জোট আরও মজবুত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার আশায় সামরিক রাষ্ট্রের প্রতি ঝোঁক এবং আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞের বিষাদময় পরিস্থিতিতে জগতের পথপ্রদর্শক হিসেবে উলামাদের প্রতি ঝোঁক—এ দুইয়ের মিশেল শক্তিশালী প্রবণতা হিসেবে দেখা দেয়। উলামা–রাষ্ট্রের এই মিশেল স্বাধীন দার্শনিকদের বিকাশে বাধা হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ যে সংকট শুরু হয়েছিল একাদশ শতাব্দীতে, সেটা এই পরিস্থিতিতে আরও দৃঢ় হয়। কুরু সতর্ক করেন, দর্শনচর্চার এই প্রান্তিকীকরণ চলা মানে এমন নয় যে এই সময়ে কোনো বড় দার্শনিকের জন্ম হয়নি বা চর্চা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ইবনে খালদুন, ইবনে রুশদ বা ইবনে আরাবিদের কথা উল্লেখ করেন। এ–ও বলেন, সম্ভবত ইবনে খালদুন মুসলিম দুনিয়ার জ্ঞান–বিজ্ঞান পুনরুদ্ধারের শেষ সুযোগ হতে পারতেন। উল্লেখ্য, কুরু এটাও বলেন যে সেই সময়ে ‘এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পারস্য সাহিত্যের সঙ্গে মিশে সুফিবাদ অধিকাংশ মুসলিম ভূখণ্ডে জনপ্রিয়তা লাভ করে’।

মুসলিম দুনিয়ার প্রাথমিক জমানায় তুলনামূলকভাবে যে সমতাভিত্তিক সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো চালু ছিল, তার স্থলে একধরনের হায়ারার্কিমূলক কাঠামো দেখা যায় এইকালে। এই সময়ে ‘উলামারা ইসলাম ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করেছিলেন, তাঁরা ওয়াক্‌ফ তহবিল ব্যবহার করতেন এবং বিচারিক ও অন্যান্য সরকারি পদে আসীন হতেন। এই সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে উলামারা মামলুক শাসকদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতেন, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং অতিরিক্ত কর আরোপের মতো বিষয়গুলোকেও তাঁরা জায়েজ করতেন।’ এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক কাঠামোকে কুরু ‘অভিজাততন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

অন্যদিকে এই সময়ে পশ্চিম ইউরোপেও সুদূরপ্রসারী রূপান্তর ঘটছিল। পশ্চিম ইউরোপ নানা কারণে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত ছিল। কৃষি উৎপাদন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। এই সময়ে কয়েকটা বড় ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। একদিকে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত অভিজাতদের পাশাপাশি বণিক ও কারিগরদের মতো নতুন শহুরে শ্রেণি গড়ে ওঠে, অন্যদিকে রাজতন্ত্রের সঙ্গে চার্চের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে আলাপ চলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গড়ে ওঠে, আরবি ভাষার মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছানো অ্যারিস্টটলীয় দর্শন বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। কুরু দাবি করেন, এই সময়ে মুসলিম দুনিয়া ও পশ্চিম ইউরোপে এই দুটি বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এক অংশে উলামা-রাষ্ট্র জোট সুসংহত হতে থাকে, অন্য অংশে এ ধরনের জোটের বিচ্ছেদ ঘটতে থাকে।

এর পরের অধ্যায়ে কুরু ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তিনটি মুসলিম সাম্রাজ্য (অটোমান, সাফাভি ও মোগল) নিয়ে আলোচনা করেন। তবে এখানে তাঁর মূল আগ্রহ মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে তৎকালীন ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পার্থক্যগুলো তুলে ধরার দিকে। তাঁর মূল যুক্তি হচ্ছে, এই তিন মুসলিম সাম্রাজ্য সামরিকভাবে প্রবল শক্তিশালী হলেও সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের দিকে নিয়ে যায়। তিনি এখানে সেই ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’কেই চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ এই জোট কয়েক শতক ধরে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাতে রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন কোনো নাগরিক সমাজের উত্থান সম্ভব ছিল না। তিনি ইউরোপের তৎকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিতুলনা করে তাঁর অবস্থানকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। যেমন একদিকে ইউরোপে সামন্ত প্রভুরা জমির বংশগত মালিক হওয়ায় তাঁরা জমি উন্নয়নে বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যে পরিস্থিতি এমন ছিল না। যেকোনো জমি কেড়ে নেওয়া যেতে পারত বলে দীর্ঘমেয়াদী কৃষিপদ্ধতি বা প্রযুক্তিতে কোনো বিনিয়োগ করা হতো না। একইভাবে অটোমান বা মোগল শাসকেরা যখন খুশি যেকোনো ব্যবসায়ীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পারতেন। এই অনিরাপত্তার কারণে ব্যবসায়ীরা বড় কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে তাঁদের সম্পদ ‘ওয়াক্‌ফ’ (ধর্মীয় ট্রাস্ট) করে রাখতেন। এটা অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দিত।

তবে অন্য একটি বড় পার্থক্য কুরু চিহ্নিত করেছিলেন: ছাপাখানার প্রযুক্তি। ইউরোপে একদিকে যেমন ছাপাখানা সফল হচ্ছিল, অন্যদিকে উদীয়মান বণিকেরা শিক্ষিত বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ ঘটাচ্ছিল। অথচ মুসলিম দুনিয়াতে এই সময়ে ছাপাখানার প্রতি তীব্র অনীহা খেয়াল করা যায়। এই বিপরীতমুখী চিত্রের ছবি তিনি তুলে ধরেন দুটো শ্রেণিকে ধরে: বুর্জোয়া শ্রেণি ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। অর্থাৎ এই সময়ে দুই অংশের এই দুই শ্রেণির বিবর্তন ছিল বিপরীতমুখী। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ১৪৫৫ সালে মাইনজ শহরে গুটেনবার্গ ব্যক্তিগত ঋণ ব্যবহার করে ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’ মুদ্রণ করেন। গুটেনবার্গের এই প্রচেষ্টা রীতিমতো ‘মুদ্রণবিপ্লব’ শুরু করে। ১৪৮০ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপের ১১০টি শহরে মুদ্রণযন্ত্র চালু হয়, যার অধিকাংশই ছিল ইতালি ও জার্মানিতে। ১৫০০ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপীয় প্রেসগুলো ১৫–২০ মিলিয়ন (দেড় থেকে দুই কোটি) কপি বই তৈরি করেছিল। অন্যদিকে কুরু বলেন, এভাবে কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোক্তার পক্ষে উদ্যোগ নেওয়া ‘উসমানীয় সাম্রাজ্যে ছিল অচিন্তনীয়’। গুটেনবার্গের প্রায় তিন শতাব্দী পর একজন উসমানীয় সরকারি কর্মকর্তা কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সরাসরি সমর্থন এবং সুলতান ও শায়খুল ইসলামের অনুমতি নিয়ে প্রথম মুসলিম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেছিলেন। ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তন সে সময়ে পশ্চিম ইউরোপে ঘটে, মুসলিম দুনিয়াতে সেটা ঘটেনি।

সপ্তম অধ্যায়ে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও মুসলিম সংস্কারপন্থীদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায় প্রধানত তুরস্কের ইতিহাসকে সামনে রেখেই আলোচনা করা হয়েছে। তিনি আগের অধ্যায়ে যে যুক্তিগুলো সাজাচ্ছিলেন, সেটিকেই তুরস্কের অভিজ্ঞতা থেকে আরও জুতসই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলছেন, পশ্চিম ইউরোপের প্রভাবে যে পশ্চিমীকরণ শুরু হয়, তার আগ পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলো কার্যকরভাবে মুদ্রণপ্রযুক্তি ব্যবহার করতেও ব্যর্থ হয়। যেখানে পনেরো শতক থেকে পশ্চিম ইউরোপীয় সমাজগুলো বাইবেলের অনুবাদের লাখ লাখ কপি পড়েছে, সেখানে বিশ শতক পর্যন্ত মুসলিম সমাজে কোরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ মুদ্রণ করা একটি ‘ট্যাবু’ বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে থেকে গিয়েছিল। উপনিবেশায়নের শিকার হওয়ার পর বিভিন্ন দেশে যে ধরনের সংস্কারপন্থী কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তাতে নতুন সংস্কারপন্থী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল। কিন্তু এর কোনোটারই বিকাশ হয়নি। বরং কুরু বলেন, উনিশ শতকে মুসলিম বিশ্ব পূর্ববর্তী শতাব্দীগুলো থেকে একাধিক বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। সংস্কারপন্থী শাসক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্ব এই সমস্যাগুলোর অধিকাংশ সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, যা বিশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল এবং আজও মুসলিম দেশগুলোকে প্রভাবিত করছে।

আগেই বলা হয়েছে, ওপনিবেশিক শোষণের কারণে মুসলিম দুনিয়ার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হয়। কুরুর মতে, সহিংসতা, কর্তৃত্ববাদ ও আর্থসামাজিক অনুন্নয়ন মোকাবিলায় উপনিবেশোত্তরকালে মুসলিম দুনিয়ার দুটো জরুরি কাজ ছিল—সৃজনশীল চিন্তক বা বিদ্বৎসমাজ এবং স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ। এই দুটোর কোনোটাই ঘটেনি। কিন্তু উপনিবেশোত্তরকালের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই একধরনের সেক্যুলার রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে ধাবিত হওয়া সত্ত্বেও তা কেন ঘটল না? এই রাজনৈতিক সেক্যুলারকরণ সত্ত্বেও কেন স্বাধীন বিদ্বৎসমাজ ও বুর্জোয়া শ্রেণির আবির্ভাব ঘটল না?

কুরুর মতে, এর তিনটি কারণ আছে। ইসলামপন্থী ও সেক্যুলাররা নিজেদের মধ্যে বহু লড়াই-সংগ্রাম চালালেও দুই পক্ষই সমাজে স্বাধীন বিদ্বৎসমাজ ও বুর্জোয়া শ্রেণিকে কুপোকাত করে রেখেছেন। প্রথমত, তুরস্ক, ইরান, মিসর, ইরাক, সিরিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষমতায় যে সেক্যুলার নেতারা আসীন হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। তাঁদের পক্ষে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বুদ্ধিজীবী ও বুর্জোয়া শ্রেণির গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত, তাঁরা শাসনব্যবস্থা হিসেবে তৎকালীন বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী ধারণাকেই আত্মস্থ করেছিলেন, যেমন ফ্যাসিবাদ বা সমাজতন্ত্র। দুটোই ছিল ভয়াবহ রাষ্ট্রবাদী ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা। সমাজের ওপর আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া এবং বুদ্ধিজীবী ও বুর্জোয়া শ্রেণির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল সেই শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তৃতীয়ত, বহু সেক্যুলার শাসকই তাঁদের শাসন জায়েজ করতে ইসলামকে ব্যবহার করেছিলেন। এটা স্বাধীন আলেম–উলামা ও বুদ্ধিজীবীর পরিবর্তে রাষ্ট্রঘেঁষা চর্চাকেই উৎসাহিত করেছিল; অর্থাৎ সেই ঐতিহাসিক ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’–এর আরেক সংস্করণ দেখতে পাওয়া গেল। উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলো একদিকে সেক্যুলারবাদী চরিত্র ধারণ করার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে জনপরিসরে ইসলামীকরণও করেছে। এটাকে বিপরীতমুখী বলে মনে হলেও দুটোই, কুরুর মতে, অ্যান্টি-বুর্জোয়া ও অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল ছিল, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের বিকাশের বিরুদ্ধে ছিল। সেক্যুলারবাদীরাও তাঁদের মতাদর্শ ও নীতির প্রয়োগে ছিলেন কর্তৃত্ববাদী। ফলে মুসলমান দুনিয়ার বহুমুখী ও ঐতিহাসিক সমস্যাগুলোর সমাধানে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।

এবার আসা যাক বইয়ের প্রথম ভাগে। এই ভাগে হাল আমলে মুসলমান–অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোর সহিংসতা, কর্তৃত্বপরায়ণতা ও আর্থসামাজিক অনুন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে, কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই জোট গড়ে উঠেছিল এবং সমসাময়িক দুনিয়াতে কীভাবে এটা কার্যকর আছে। এর প্রভাব কীভাবে এখনো সক্রিয়, সেটা এই অংশে দেখানো হয়েছে। গত কয়েক দশক যাবৎ বিভিন্ন কিসিমের সহিংসতায় মুসলমানদের অংশগ্রহণকে ইসলামের ‘মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে দেখানো বা ব্যাখ্যা করার চল থাকলেও কুরু এটাকে উড়িয়ে দেন। ধর্ম সর্বদাই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার এক খোলা ময়দান; আবার ধর্মতত্ত্ব ও মানুষের বাস্তবিক আচরণের মধ্যে ফারাকও বিস্তর। পাশাপাশি সহিংসতা এমন এক জটিল সমস্যা, তা কেবল ধর্মীয় বা সেক্যুলার ইত্যকার ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তিনি পশ্চিমা উপনিবেশবাদকেই দায়ী করেন। পাশাপাশি ইসলামের একটি ‘সুনির্দিষ্ট’ তফসিরকে এই সহিংসতার পক্ষে কাজে লাগানো হচ্ছে। কুরু দাবি করেন, এই সহিংস গোষ্ঠীগুলোর কাজ ও প্রোপাগান্ডাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে মুসলমান সমাজ মোটা দাগে ব্যর্থ হয়েছে। উলামাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কার্যকর পাল্টা যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি। সহিংসতাপন্থী এই ব্যাখ্যাগুলো বরং উলামা ও সুফি তরিকার ঐতিহ্যবাহী কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করে আরও চরমপন্থী ব্যাখ্যা হাজির করেছিল। এই পুরো পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে কর্তৃত্ববাদ। মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই কর্তৃত্ববাদী, সেগুলোর শাসক সেক্যুলার বা ইসলামপন্থী যা–ই হোন না কেন। কর্তৃত্ববাদের দমনমূলক নীতি যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে; কিংবা এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা সহিংসতাকেই উসকে দিচ্ছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্রায়ণের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তবে এই বিদেশি নীতিগুলোকে কুরু নিজেদের আদর্শিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার ‘কারণ’ না বলে বরং ‘ফল’ হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠী সাধারণত অনেক মুসলিম দেশে পিতৃতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের প্রসারে অবদান রেখেছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিকও ছিল। এখানে কুরু একাদশ শতাব্দী থেকে বিকশিত কিছু ‘অনুদার’ চিন্তাকে চিহ্নিত করেন, যেগুলোর প্রভাব নানাভাবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি মনে করেন, কেবল প্রাচ্যবাদী সাধারণীকরণ এড়াতে এই ধারণাগুলোর সঙ্গে কর্তৃত্ববাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণের বাইরে রাখা উচিত হবে না। বিভিন্ন ইসলামপন্থীর প্রচার ও সক্রিয়তা অনেক মুসলিম দেশে সাম্প্রতিক ‘আইনি ও রাজনৈতিক ইসলামীকরণ’-এর ধারাকে ত্বরান্বিত করেছে। ১৯২০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক ও আইনি ধারা ছিল সেক্যুলার বা ইহজাগতিক। কিন্তু গত চার দশকে অনেক দেশের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় ইসলামীকরণ ক্রমে প্রাধান্য পেয়েছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সেক্যুলার ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে লড়াই চলমান থাকলেও রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশই কর্তৃত্ববাদী। সুতরাং মুসলিম বিশ্বে কর্তৃত্ববাদের সমস্যাকে কেবল সেক্যুলার রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সেক্যুলার ও ইসলামি—উভয় ধরনের রাষ্ট্রই মূলত কর্তৃত্ববাদী হওয়াটাকে এর একটা ইশারা হিসেবে পাঠ করা যায়। তাঁর মতে, এই সংকট আসলে আরও গভীর ঐতিহাসিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় প্রোথিত। কর্তৃত্ববাদী এই শাসকগোষ্ঠীর অবস্থান সর্বদা ‘অ্যান্টি-ইন্টেলেকচুয়াল’।

কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলো, বিশেষত আরব দেশগুলোর সম্পর্কে আলাপ করতে অর্থনৈতিক দিকেও নজর দেন আহমেত কুরু। তাঁর মতে, মুসলিম দুনিয়ার একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যা হচ্ছে, ‘রেন্টিয়ারিজম’ (Rentierism)। যখন কোনো রাষ্ট্র তার আয়ের সিংহভাগ উৎপাদনশীল খাত (যেমন শিল্প বা কৃষি) থেকে কর আদায়ের পরিবর্তে প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল, গ্যাস) বা বিদেশি সাহায্য থেকে পায়, তখন তাকে রেন্টিয়ার স্টেট বলে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার জনগণের ওপর কর আরোপ করে, ফলে জনগণ সরকারের জবাবদিহি দাবি করার অধিকার পায়। কিন্তু তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে (যেমন সৌদি আরব বা ইরান) সরকারকে জনগণের করের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে শাসকেরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন মনে করেন না। তেলের টাকা শাসকদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। তাঁরা এই টাকা দিয়ে বিশাল এক অনুৎপাদনশীল আমলাতন্ত্র ও ধর্মীয় এলিট (উলামা) শ্রেণিকে পুষে রাখতে পারেন। উলামারা এই অর্থের বিনিময়ে শাসকের স্বৈরাচারী ক্ষমতার ধর্মীয় বৈধতা প্রদান করেন।

কুরু তুরস্কের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন যে তেল না থাকা সত্ত্বেও এরদোয়ান সরকার আন্তর্জাতিক ঋণ ও রিয়েল এস্টেট খাতের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘আধা রেন্টিয়ার’ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা তাঁকে পুরোনো উলামা-রাষ্ট্র জোটের একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এখানে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়। একদিকে রেন্টিয়ার অর্থনীতি শাসককে স্বৈরাচারী হওয়ার সম্পদ দেয়, অন্যদিকে স্বৈরাচারী শাসক তাঁর ক্ষমতার বৈধতার জন্য উলামাদের ওপর নির্ভর করেন। পাশাপাশি উলামারা তাঁদের রক্ষণশীল জ্ঞানতত্ত্বের মাধ্যমে এমন এক সমাজ তৈরি করেন, যেখানে স্বাধীন বুদ্ধিজীবী বা শক্তিশালী বণিকশ্রেণি (যারা স্বৈরাচারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে) গড়ে উঠতে পারে না। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে পন্থারই শাসনব্যবস্থা হোক না কেন, উভয়টাই ‘রেন্ট’–এর (বিশেষত তেলের রাজস্ব) ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল। কুরু তেলনির্ভর এই রেন্টিয়ারিজম দিয়ে কেবল কর্তৃত্ববাদ নয়, বরং সহিংসতাকেও বুঝতে বলেন। বিভিন্ন গবেষকের বরাতে তিনি বলেন, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো আন্তরাষ্ট্রীয় ও অভ্যন্তরীণ সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকে বেশি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় তেলের রাজস্ব সরাসরি কর্তৃত্ববাদের জন্ম দিয়েছে, যা প্রকারান্তরে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

কুরু বলেন, ‘তেলের রাজস্ব অনেক ক্ষেত্রে উলামা-রাষ্ট্র জোটের আধিপত্য এবং বুর্জোয়া (বণিক) শ্রেণির প্রান্তিকীকরণেও অবদান রেখেছে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে যখন তেলের বিশাল রাজস্ব আসা শুরু হয়, তখন মুসলিম দেশগুলোতে বুর্জোয়া শ্রেণি এমনিতেই প্রান্তিক অবস্থায় ছিল। এর পর থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রেন্টিয়ার রাষ্ট্রগুলো তেলের রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ শুরু করে এবং তাদের ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান প্রায় অসম্ভব করে তোলে। বিভিন্ন রেন্টিয়ার রাষ্ট্রের ব্যবসায়ী অভিজাতরা সরকারের সঙ্গে এত বেশি জড়িয়ে গেছেন যে তাঁদের পক্ষে স্বাধীন বুর্জোয়া হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। শাসকশ্রেণির ক্ষমতা পরীক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—এমন একটি স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণি ছাড়া গণতন্ত্র কাজ করতে পারে না।’ আঞ্চলিক প্রসারের মাধ্যমে তেলের রাজস্বের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে এমনকি তেলহীন দেশগুলোকেও (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে) প্রভাবিত করেছে।

তৃতীয় অধ্যায়ে বরং এই অনুন্নয়নের বহুবিধ কারণ অনুসন্ধান করেন কুরু। তিনি উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্থানীয় উপাদানগুলোও আমলে নিতে চান। তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদ ও আর্থসামাজিক অনুন্নয়ন একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। আর্থসামাজিক ও শাসনব্যবস্থার সমস্যাগুলোর সঙ্গে দুর্নীতি ও আস্থার অভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুরু দেখান যে অধিকাংশ মুসলিম দেশেই উচ্চমাত্রার দুর্নীতি এবং নিম্নস্তরের পারস্পরিক আস্থা পরিলক্ষিত হয়। যেমন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বব্যাপী সরকারি খাতের দুর্নীতির একটি ধারণা পরিমাপ করে, যেখানে ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি স্কেল ব্যবহার করা হয়—০ মানে ‘অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ১০০ মানে ‘অত্যন্ত স্বচ্ছ’। ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম দেশগুলোর গড় স্কোর (৩১) বিশ্বের গড় স্কোরের (৪২) তুলনায় অনেক বেশি দুর্নীতি নির্দেশ করে। পারস্পরিক আস্থার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এমন নিম্নহার দেখা যায়। ফলে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ও অর্থনীতিতে কর্তৃত্ববাদী হস্তক্ষেপ যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়।

একইভাবে রয়েছে প্রতিষ্ঠান তৈরির ব্যর্থতা। কোনো রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। কিন্তু মুসলিম দুনিয়াতে উলামা ও রাষ্ট্রশক্তির আঁতাতের ফলে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা কেবল মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। এখানে বুদ্ধিজীবী ও স্বাধীন ব্যবসায়ী শ্রেণিকে সব সময় কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি উলামাদের রক্ষণশীল একাংশকেও এর জন্য দায়ী করেন, যারা যেকোনো ধরনের পরিবর্তনকে ধর্মীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।

আহমেত কুরুর মূল থিসিসটি আসলে বারবার রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার একধরনের বিচ্ছেদের দিকে ইশারা করছে। এটা করতে গিয়ে তাঁকে আরেকটা প্রশ্ন সামাল দিতে হয়েছে। যাঁরা ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’–এর পক্ষে কথা বলেন, তাঁরা দাবি করেন যে ইসলাম অপরিহার্যভাবে এই পৃথক্‌করণকে খারিজ করে দেয়। অর্থাৎ ইসলাম ও রাজনীতিকে একাকার করে দেখানো হয়। প্রখ্যাত ইসলামপন্থী চিন্তক হাসান আল–বান্নার উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে, ‘আল-ইসলাম দ্বীন ওয়া দাওলাহ।’

আহমেত কুরু বলেন, প্রচলিত এই ধারণার পেছনে দুটি প্রধান উৎস রয়েছে। প্রথম উৎসটি হলো পশ্চিমা পণ্ডিতদের কাজকারবার। তাঁরা একাদশ শতাব্দীতে বা তার পরে লেখা উলামাদের ‘ছদ্ম-ইসলামি’ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকেই ইসলামের মূল সংজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটা করতে গিয়ে কখনো কখনো বিভিন্ন উদ্ধৃতি বা উক্তি ভুলভাবেও হাজির করা হয়েছিল। যেমন প্রখ্যাত এক লেখক, ‘ধর্ম ও রাজকীয় কর্তৃপক্ষ যমজ ভাই’—এমন সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রবাদকে হাদিস বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় উৎস হলো ইসলামপন্থীদের প্রচারণা। তাঁরা ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন, ইসলাম রাষ্ট্র থেকে ধর্মের পৃথক্‌করণের বিরোধী। তাঁরা খুব কম জায়গায় ক্ষমতাসীন হলেও দুনিয়ার জনজীবনের ‘ইসলামীকরণ’ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছেন। বিংশ শতাব্দীতে হাসান আল–বান্না, আবুল আলা মওদুদী ও রুহুল্লাহ খোমেনির মতো ইসলামপন্থী নেতারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথক্‌করণ খারিজ করে ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’-এর সমর্থনকে আরও জ্বালানি দিয়েছেন। আল–বান্না বলেছিলেন, ইসলাম একই সঙ্গে ধর্ম ও রাষ্ট্র; খোমেনি বলেছিলেন, ধর্ম ও রাজনীতির পৃথক্‌করণের স্লোগান এবং ইসলামি পণ্ডিতদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার দাবি সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা প্রচারিত হয়।

কিন্তু এটিই একমাত্র চিন্তাধারা নয়, বরং বহু ইসলামি চিন্তাবিদ এর বিপরীতে মতামত দিয়েছেন। কেউ কেউ দেখিয়েছেন যে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে একধরনের বিচ্ছেদ বিদ্যমান ছিল। যে জোটের কথা বলা হচ্ছে, তার উদ্ভবও আরও পরে হয়েছে। অনুরূপভাবে কুরু তিনজন মুসলিম চিন্তাবিদের কথা বলেন—সৈয়দ বে, আলী আবদেল রাজেক ও গামাল আল-বান্না—যাঁরা দাবি করেছিলেন, ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথক্‌করণ ইসলামি চিন্তা ও চর্চারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্যে গামাল আল-বান্না ছিলেন হাসান আল-বান্নার ভাই। গামাল যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সহজাতভাবেই যেকোনো ধর্মকে কলুষিত করে, ইসলামও যার ব্যতিক্রম নয়। তিনি কোরআনের সেই আয়াতগুলো উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন ‘রাসুল’, ‘শাসক’ নন; মানুষের হৃদয়ে ইমান আনা আল্লাহর কাজ, কোনো মনুষ্য কর্তৃপক্ষের নয়। ইসলাম মূলত একটি ‘উম্মাহ’ বা সম্প্রদায়ের ওপর জোর দেয়, রাষ্ট্রের ওপর নয়। গামাল মনে করতেন, নবী (সা.)–এর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে বর্তমান সময়ে ‘মডেল’ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়; কারণ, আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন ও অন্যান্য সক্ষমতার তুলনায় নবী (সা.)–এর শাসনপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

হাসান আল-বান্না, মওদুদী ও খোমেনির বিপরীতে যাঁদের চিন্তা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথক্‌করণকে সমর্থন করেছিল, রাজনীতির ময়দানে তাঁদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কুরুর মতে এর কারণ দুটো। প্রথমত, তাঁরা পড়ে গিয়েছিলেন দুই কট্টরপন্থীদের মাঝখানে। তাঁদের ‘মধ্যপন্থা’ ইসলামপন্থী ও সেক্যুলারপন্থী কারও সমর্থনই আদায় করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তুরস্ক, মিসরসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে এই উলামা-রাষ্ট্র জোট এতই গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে এমন যেকোনো চিন্তাকেই প্রান্তিক করে তোলা হয়েছিল, এমনকি নির্যাতনের মুখেও ফেলা হয়েছিল।

বইটি জুড়ে কুরু খুব সাধারণ একটা সমীকরণ তুলে ধরেন। বুর্জোয়া শ্রেণি ও বিদ্বৎসমাজ না থাকলে উন্নয়নও হবে না। তিনি আসলে এই সংকটের সুলুকসন্ধান করেছেন। সমসাময়িক বাস্তবতা যেমন আমলে নিয়েছেন, তেমনি সমস্যার ঐতিহাসিক সংকট খোঁজার চেষ্টা করেছেন। পুরো বিচার–বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট আন্দাজ করা যায়, তিনি যে সুপারিশ বাতলাবেন, সেটা অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ সমাধান। তিনি বলছেন, সেক্যুলারপন্থী ও ইসলামপন্থী সবাই কেবল রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ কব্জা করে অন্য পক্ষকে নির্মূল করতে চেয়েছে। কেবল পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে দোষারোপ করে কুরু ক্ষান্ত হতে চান না। তাঁর মতে, পশ্চিমাবিরোধিতা বা সেক্যুলার-ইসলামপন্থী রেষারেষি—কোনোটিই মুসলমানদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে না। বরং উভয় পক্ষকেই বুদ্ধিবৃত্তিবিরোধী মনোভাব ও অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে। এটাই আসলে তাঁর মূল সুপারিশ। ‘উলামা-রাষ্ট্র জোট’–কে ইসলামের মৌলিক পাঠের অংশ বা ইসলামি ইতিহাসের চিরস্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে না দেখে নতুনভাবে এটা কল্পনা করতে হবে। ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ককে এমনভাবে নতুন করে সাজাতে হবে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করবে।

কুরু গ্রন্থটি জুড়ে এটাই দেখিয়েছেন যে চলমান ধারণার বাইরেও একধরনের সম্পর্ক ইসলামের ইতিহাসেই পাওয়া যায়। তিনি মুসলমানদের ইতিহাসকে পর্যালোচনামূলকভাবে পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। উলামা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে—এমন সৃজনশীল বুদ্ধিজীবী ও একটি স্বাধীন বুর্জোয়া (বণিক) শ্রেণি বিকাশের জন্য আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রায় ব্যাপক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন কুরু।

আহমেত কুরু পুরো ইসলামি ইতিহাস ও মুসলমান সমাজের ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তাঁর মূল থিসিসকে কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে না দেখে বরং নানা শ্রেণিসংঘাত ও রাজনৈতিক জোটের প্রেক্ষাপটে হাজির করেছেন। তথ্য-উপাত্ত ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তিনি প্রচলিত জনপ্রিয় বেশ কিছু ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নতুন প্রস্তাব হাজির করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ধরন, আকার ও প্রভাব হ্রাসের সঙ্গে সহিংসতা ও অনগ্রসরতার সম্পর্ক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।

তবে দুটো প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, তিনি যে উলামা-রাষ্ট্র জোটের কথা বলেন, তার স্থায়িত্ব কি পুরো সময়জুড়ে একইভাবে ক্রিয়াশীল ছিল? দ্বিতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা মুসলমান–অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে কি এই ‘জোট’ ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর ছিল? যেমন বাংলাদেশের প্রশ্ন তুললেই এর ঐতিহাসিক দিকটা চোখে পড়তে পারে।

আরও দুটি বিষয় যেকোনো সচেতন পাঠকের দৃষ্টি এড়াবে না। প্রথমত, কুরু যেভাবে ইতিহাস বর্ণনা করছেন, তাতে এক ধরনের সরলরৈখিক বর্ণনা রয়েছে। ইউরোপ এগিয়ে গেছে এবং কীভাবে বাকিরা ‘পেছনে’ পড়ে আছে, এই প্রশ্ন কুরুর পুরো বইয়ে রয়েছে। যেসব উপাদানের জন্য ইউরোপে উন্নয়ন ঘটেছে, তার ঘাটতিই যেন এখানে অনুন্নয়ন ঘটাচ্ছে। পশ্চিম ইউরোপের মানদণ্ডে ‘উন্নত’ হওয়ার বাসনা এই গ্রন্থের ভাষায় প্রবলভাবে জুড়ে রয়েছে। কিন্তু উত্তর-উপনিবেশবাদী চিন্তাচর্চা এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিকে বহুদিন ধরে প্রশ্ন করে আসছে।

এ প্রশ্নের উত্তরে কুরু বলতে পারেন, তিনি তুলনামূলক ঐতিহাসিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয়ত, উলামা বলে যে বর্গটির কথা তিনি বলছেন, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, কারা থাকবেন সেই বর্গে, তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন করা হয়নি। খোদ উলামা বা রাষ্ট্র-প্রণোদিত মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে যে বিবিধ বাহাস ও তর্কমূলক চর্চা জারি আছে, তার কোনো খবর এখানে পাওয়া যায় না। বরং পুরো উলামাবর্গকে একশিলা উপাদান বলেই মনে হয়। এমনকি উপনিবেশবিরোধী বা সেক্যুলার রাষ্ট্রের হাতেও যে উলামারা নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, সেটাও আড়ালে পড়ে যায়।

আহমেত কুরুর এই গ্রন্থ বর্তমান দুনিয়ায় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সংকট বুঝতে দারুণভাবে সহায়তা করে। গ্রন্থে যে ঐতিহাসিক উপাদান রয়েছে, সেগুলোর গাঁথুনি নিঃসন্দেহে মজবুত; মূল থিসিসটিও অভিনব। আর কিছু হোক বা না হোক, স্বাধীন বিদ্বৎসমাজ বিকাশের প্রয়োজনীয়তা বইটিতে ইতিহাসসমেত উঠে এসেছে।

লেখক পরিচিতি

সহুল আহমদ, লেখক ও গবেষক। পড়াশােনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশাগত জীবনে গণহত্যা জাদুঘর এবং পিআইবি-তে গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোতে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। আগ্রহের বিষয় ইতিহাস, জেনোসাইড অধ্যয়ন, মুক্তিযুদ্ধ, সহিংসতা, বিউপনিবেশায়ন ও ধর্ম। রাষ্ট্রচিন্তা জার্নাল, ‘অরাজ’ এবং ‘আখড়া’ নামক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থ : ইতিহাস ও বয়ান: পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (২০২৬), In Defense of July Uprising: Autocracy, Resistance and Democracy (২০২৫), মারণ-রাজনীতি: রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও সহিংসতার বয়ান (সহ লেখক-সারোয়ার তুষার, ২০২৪), সাম্প্রদায়িকতা : ক্ষমতা ও রাজনৈতিকতা (সহ লেখক-সারোয়ার তুষার, ২০২৪) শ্বাস নেওয়ার লড়াই: রাষ্ট্র, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার (২০২৩), জহির রায়হান : মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ভাবনা (২০১৯)। সম্পাদিত গ্রন্থ : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রবন্ধ (২০২৫)। অনূদিত গ্রন্থ : ইবনে খালদুন : জীবন চিন্তা ও সৃজন (রবার্ট আরউইন, ২০২০)।

Read at source