বেড়ায় ১৩ বছরে এক দিনও নৌ অ্যাম্বুলেন্সের সেবা পাননি চরবাসী

· Prothom Alo

মাস দেড়েক আগের ঘটনা। পাবনার বেড়া উপজেলার চরসাফুল্যা গ্রামে যমুনার দুর্গম চরে প্রসব বেদনা ওঠে এক প্রসূতির। সকাল থেকে দাই ও হাতুড়ে চিকিৎসকের চেষ্টাতেও প্রসব সম্ভব হয়নি। প্রতিবেশী আবুল কাশেম দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু বিকেলে কোনো ইঞ্জিনচালিত নৌকা না পেয়ে বিপাকে পড়েন সবাই।

Visit playerbros.org for more information.

শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পর কষ্টে একটি ছোট নৌকা জোগাড় করে কয়েক ধাপে তাঁকে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন মা ও সন্তান। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে কয়েক ঘণ্টা আগেই হাসপাতালে পৌঁছানো যেত, কমে যেত ঝুঁকি।

আবুল কাশেম বলেন, ‘আমি নিজেও ওই রোগীর সঙ্গে ছিলাম। অনেক কষ্টে নৌকা জোগাড় করে হাসপাতালে নিতে হইছে, তাতেই ম্যালা সময় নষ্ট হইছে। শুনছি চরবাসীর জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু ১০-১২ বছর ধইর‌্যা নষ্ট। চালু থাকলে এভাবে ভোগান্তি হইত না।’

বেড়া উপজেলার প্রায় এক লাখ চরবাসীর জন্য বরাদ্দ হওয়া নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য এমন আফসোস করেন অনেক চরবাসী। এক যুগের বেশি আগে বরাদ্দ পাওয়া নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এক দিনের জন্যও সেবা দিতে পারেনি। এখন সেটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আগাছা ভরা অংশে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে সরকার একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি কখনোই মানুষের কাজে আসেনি। চালু তো দূরের কথা, এক দিনের জন্যও সেটিকে চরে গিয়ে রোগী আনতে দেখেননি স্থানীয় লোকজন। দীর্ঘদিন নদীর পানিতে ডুবে থেকে অকেজো হয়ে পড়েছে। ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই চুরি হয়ে গেছে।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মানুষের জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ পরিকল্পনার অভাব ও তদারকির ঘাটতির কারণে শুরু থেকেই ব্যর্থ হয়েছে। এতে চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বেড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মা ও যমুনা নদীর চরাঞ্চল দিয়ে ঘেরা। দুই নদীর প্রায় ২৫টি চরে প্রায় এক লাখ মানুষের বাস। এসব এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা মূলত নৌপথনির্ভর। বর্ষা মৌসুমে অনেক গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে নৌকা বা ট্রলারের ওপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প থাকে না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নৌপথে রোগী পরিবহনের জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চরাঞ্চল থেকে দ্রুত রোগী এনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা শহরে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

দক্ষিণ চরপেঁচাকোলা গ্রামের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বলেন, নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালু থাকলে নৌপথে দুর্ঘটনা বা হঠাৎ অসুস্থতার সময় অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করা যেত। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও গুরুতর রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকায় সেটি এখন অচল হয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে ওয়ান বেড ক্লিনিক বোটটি (নৌ অ্যাম্বুলেন্স) বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। কিন্তু হাসপাতালে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও জনবল না থাকায় এটি প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নদীতে রাখা হয়। তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় অযত্নে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় দুর্বৃত্তরা সেটি ঘাটের কাছেই নদীতে ডুবিয়ে দেয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৭ সালে তৎকালীন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আইয়ুব হোসেন অ্যাম্বুলেন্সটি অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানালেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় লোকজন নতুন করে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত মেরামত করে চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাহমিনা ইয়াসমিন বলেন, ২০১৩ সালে অ্যাম্বুলেন্সটি এলেও কেন চালু করা যায়নি, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি এটিকে অচল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনাল্ট চাকমা বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। কেন দীর্ঘদিন এটি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে এবং চরাঞ্চলের মানুষ যাতে জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Read at source