মেক্সিকান বন্ধু অ্যালেন পরেছিল পাঞ্জাবি, আর চিলিয়ান বন্ধু জেইন পরেছে শাড়ি
· Prothom Alo

ঈদে সবারই যে ‘স্বপ্ন বাড়ি ফেরে’, তা তো নয়। অনেকেই দেশ থেকে হাজারো মাইল দূরের কোনো ভিনদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদ উদ্যাপন করেন। বাড়ির জন্য মন কাঁদে ঠিক। তবে ভিন্ন পরিবেশে, নানা দেশের সহপাঠী–বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনেরও কিন্তু একটা আলাদা আনন্দ আছে। সে আনন্দের কথাই লিখে জানিয়েছেন মাহমুদুর রহমান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইস্টার্ন ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থী।
ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে প্রথম যখন ইউরোপে আসি, তখনো জানতাম না প্রবাসে আমার প্রথম ঈদটা এতটা প্রাণবন্ত হবে।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টার কাটে ফ্রান্সে, জানুয়ারিতে দ্বিতীয় সেমিস্টারে নতুন গন্তব্য হয় ফিনল্যান্ডের ইউয়েন্সু। মাইনাস ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রির হাড়কাঁপানো শীত আর তুষারপাতের মধ্যে কেটেছে রমজান আর প্রবাসের প্রথম ঈদ।
ক্লাস-পরীক্ষার মধ্যেই রোজা রাখতে হয়েছে। এমন দিনও গেছে, ল্যাবে কাজ করতে করতে ইফতারের সময় হয়ে গেছে। এক চুমুক পানি খেয়েই রোজা ভেঙেছি। তখন খুব মনে পড়ত দেশের কথা, মায়ের হাতে বানানো ইফতারির কথা। তার মধ্যেও আমাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল ইউয়েন্সুর মুসলিম কমিউনিটি। ছোট্ট এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা একমাত্র মসজিদে বাঙালি ও পাকিস্তানি কমিউনিটি আয়োজিত ইফতারগুলো প্রবাসের একাকিত্ব অনেকটাই ভুলিয়ে দিত।
বিদেশি বন্ধুরা তেহারি মুখে দিয়ে বলছিল, ‘দিস ইজ টু স্পাইসি!’দেশে ঈদের দিন মায়ের ডাকাডাকিতে সকালে ঘুম ভাঙত। আর এখানে ঘুম ভাঙাল ফোনের নিষ্প্রাণ অ্যালার্ম! ঘুম থেকে উঠেই মনটা হু হু করে উঠল। দেশে ফোন দিলাম, আম্মু ‘ঈদ মোবারক’ জানালেন। কিন্তু দেশে তখনো রোজা, পরের দিন ঈদ। দেশে থাকলে ঈদের সকালে গোসল সেরে আগের রাতেই গুছিয়ে রাখা নতুন কাপড় পরা, মায়ের হাতে মিষ্টিমুখ করে বন্ধুদের সঙ্গে জায়নামাজ হাতে হই হই করে ঈদগাহে যাওয়ার যে আনন্দ—তার কিছুই এখানে নেই। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, বিদেশের ঈদ খুব একঘেয়ে আর বোরিং। এই ভেবে মন খারাপ করে বসেছিলাম।
কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভুল ভাঙতে শুরু করল। সিটি সেন্টার থেকে আট কিলোমিটার দূরে এক মিলনায়তনে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়েছে। আমি ও আমার চার পাকিস্তানি বন্ধু মিলে বাসে করে রওনা হলাম। পাকিস্তানি বন্ধুদের গায়ে কুর্তা, আমার গায়ে পাঞ্জাবি। বাসে উঠতেই আরও অনেক মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। এক ঘণ্টার বাসযাত্রায় অচেনা মানুষদের সঙ্গেও ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। ঈদগাহে পৌঁছে যখন দেখলাম শত শত ভিনদেশি মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করল। নামাজ শেষে একেবারেই অচেনা মানুষদের সঙ্গে যখন কোলাকুলি করছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন কত যুগের চেনা! ইসলাম যে কী দারুণ এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করতে পারে, বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেদিন নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
দুপুরে পাকিস্তানি বন্ধু বিলালের বাসায় ছিল বিরিয়ানির আয়োজন। আমরা ছাড়াও আমন্ত্রিত ছিল মেক্সিকান বন্ধু অ্যালেন, আর চিলি থেকে আসা আরেক বন্ধু জেইন। ওরাও আমাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এসেছিল। অ্যালেন পরেছিল পাঞ্জাবি, আর চিলিয়ান বন্ধুটি শাড়ি!
বিকেলে আমাদের এক ইরানি বন্ধুর বাসায় ‘নওরোজ’ (নববর্ষ) পার্টিতে দাওয়াত ছিল। সেখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ১০-১৫ জন সহপাঠী মিলে দারুণ সময় কাটিয়েছি। এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর একটা ছোট ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলাম, যেখানে আমার ভিনদেশি বন্ধুরাও ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করেন ইউরোপে বা অমুসলিম দেশগুলোতে মুসলিমরা স্বাধীনভাবে উৎসব পালন করতে পারে না, বা সেখানে চরম ইসলামোফোবিয়া কাজ করে। আমার নিজেরও কিছুটা এমন ধারণা ছিল। কিন্তু এই ঈদ আমার সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। রাস্তায় হাঁটার সময় অনেক স্থানীয় অমুসলিমও আমাদের আনন্দে শরিক হয়েছেন, হাসিমুখে অভিবাদন জানিয়েছেন। এখানে সবাই সবার ধর্মীয় উৎসবকে সাদরে গ্রহণ করে।
রাতে ইউয়েন্সুর অন্ধকার আকাশে প্রথমবারের মতো দেখি জাদুকরী ‘নর্দার্ন লাইটস’ বা অরোরা বোরিয়ালিস। প্রকৃতির পক্ষ থেকে যেন এটাই ছিল আমাদের ‘ঈদসালামি’!
‘ক্যাম্পাসের ক্যানটিন থেকে ভূমধ্যসাগর দেখা যায়’