মাহবুবা রহমান: নিভৃতচারী এক শিল্পীর কথা

· Prothom Alo

ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গায়িকা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মাহবুবা রহমান বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০১৫ সালে তাঁকে নিয়ে গীতিকার কবির বকুল–এর লেখা ‘নিভৃতচারী এক শিল্পীর কথা’ শীর্ষক ফিচারটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

গত শতকের পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশক দাপটের সঙ্গে গান করলেও অজানা এক অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে নেন প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর প্রথম প্লেব্যাক শিল্পী মাহবুবা রহমান। সংগীতাঙ্গনে যিনি এখন অনেকটাই বিস্মৃতির সময়ের মানুষ। এ বছরের (২০১৫ সাল) ৩ মার্চ বয়সের কোটা আশি পার করেছেন। বয়সের কারণে স্মৃতি হাতড়ে বলাটাও তাঁর জন্য কিছুটা মুশকিল। কিছুক্ষণ মনে করার চেষ্টা করেন, তারপর কিছু বলেন। তাই আলাপচারিতার অনেকটা অংশজুড়েই সহায়ক হিসেবে ছিলেন তাঁর ছোট মেয়ে সংগীতশিল্পী রুমানা ইসলাম।

Visit rouesnews.click for more information.

মাহবুবা রহমান ১৯৫৬ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আব্দুল জব্বার খানের “মুখ ও মুখোশ’ ছবিতে প্লেব্যাক করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। শান্তিনগরের যে বাড়িতে গানটির রেকর্ড হবে, সেই বাড়িটি ছিল মূল সড়কের পাশেই। তখন গান করাটা এত সহজ ছিল না।

বললেন, ‘১৯৫৬ সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আব্দুল জব্বার খানের “মুখ ও মুখোশ” ছবিতে প্লেব্যাক করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। শান্তিনগরের যে বাড়িতে গানটির রেকর্ড হবে, সেই বাড়িটি ছিল মূল সড়কের পাশেই। তখন গান করাটা এত সহজ ছিল না। বাইরে থেকে যেন কোনো শব্দ না শোনা যায়, তাই নেওয়া হলো অভিনব বন্দোবস্ত। যে ঘরটায় আমরা বসেছি, সেটা মুড়িয়ে দেওয়া হলো কাপড় দিয়ে। সেতার, বাঁশি, বেহালা, তবলা আর ঢোলের শিল্পীরা গানটিতে সংগত করেন। তখন গান রেকর্ডিং খুবই কঠিন ছিল। একটু ভুল হলে আবার রেকর্ড করতে হতো। বেশ কবার কাট হওয়ার পর আমার গাওয়া “মনের বনে দোলা লাগে” গানটি ওকে হয়। গানটির সংগীত পরিচালক ছিলেন সমর দাস। মনে আছে, জামান সাহেব আকাই রেকর্ডারে গানটি ধারণ করেন।’

‘মুখ ও মুখোশ’-এর গায়িকা মাহবুবা রহমান মারা গেছেনদুই বন্ধু—পিয়ারী বেগম ও মাহবুবা রহমান

এরপর বললেন, ‘আরেকটি গানের কথা খুব মনে পড়ে। আমাদের বিখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর গান করার। তাঁর সুরে ফতেহ লোহানীর “আসিয়া” ছবির “আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে” গানটি গেয়েছিলাম। তিনি নিজেই আমাকে গানটি শিখিয়েছিলেন। ঢাকায় তখন কোনো রেকর্ডিং স্টুডিও না থাকায় গানটির রেকর্ড হয় বিজি প্রেসে। যেটি আসলে একটি ছাপাখানা।’

মাহবুবা রহমান আরেকটি গানের কথা খুব মনে পড়ে। আমাদের বিখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর গান করার। তাঁর সুরে ফতেহ লোহানীর “আসিয়া” ছবির “আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে” গানটি গেয়েছিলাম। তিনি নিজেই আমাকে গানটি শিখিয়েছিলেন। ঢাকায় তখন কোনো রেকর্ডিং স্টুডিও না থাকায় গানটির রেকর্ড হয় বিজি প্রেসে। যেটি আসলে একটি ছাপাখানা।

জানালেন, এরপর তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সরোদবাদক তিমিরণের সুরে এবং কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লেখা ‘মোতি হো কে সিসা হো, জো টুট গ্যায়া’ গানটি করেন। এ ছবির পরিচালক ছিলেন এ জে কারদার। ছবির নায়ক-নায়িকা ছিলেন খান আতাউর রহমান ও তৃপ্তি মিত্র।

শিল্পী মাহবুবা রহমান

মাহবুবা রহমান নিজের সংগীতগুরু মমতাজ আলী খানের সুরে অনেকগুলো গান করেন। দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এই গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বৈদেশি নাগর’, ‘যাইও না যাইও না বৈদেশে যাইও না’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’ ছবির ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’ গান।

স্বামী খান আতাউর রহমানের সঙ্গে প্রথম রেডিওতে তিনি গেয়েছেন ‘আমার থাকত যদি পাখির মতো ডানা’ গানটি।

মাহবুবা রহমান নিজের সংগীতগুরু মমতাজ আলী খানের সুরে অনেকগুলো গান করেন। দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া এই গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বৈদেশি নাগর’, ‘যাইও না যাইও না বৈদেশে যাইও না’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’ ছবির ‘আগুন জ্বালাইস না আমার গায়’ গান।

১৯৬১ সালে জহির রায়হানের ‘কখনো আসেনি’ ছবিতে খান আতাউর রহমানের সুরে দুটি গান করেন—‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ ও ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’। ১৯৬৮ সালে করাচির হিজ মাস্টার ভয়েস থেকে খান আতাউর রহমানের সুরে এই শিল্পীর কিছু গান রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ‘আমার যদি থাকত পাখির ডানা’, ‘আমার না–বলা কথা’, ‘সোনালি এই ধানের খেতে’, ‘আগে জানি না রে দয়াল’, ‘তুমি দাও দেখা দরদি’, ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়া’, ‘আজকে আমার মালঞ্চে ফুল ফোটে নাই’, ‘আমার মন ভালো না গো প্রাণ ভালো না গো’ গানগুলো উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতেও গান করেন। পাশাপাশি ‘সোনার কাজল’, ‘যে নদী মরুপথে’, ‘রাজা সন্ন্যাসী’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতেও প্লেব্যাক করেন তিনি।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত লোক উৎসবে অংশগ্রহণ করেন মাহবুবা রহমান। বললেন, ‘রেডিও থেকে লায়লা আঞ্জুমান্দ বানু আর আব্দুল আলীমও গিয়েছিলেন সেখানে। আমাদের তিন শিল্পীর গান খুব প্রশংসিত হয়। এর পরের বছর আমরা যাই পেশোয়ার, লাহোর ও করাচিতে।’
কথা হচ্ছিল (২০১৫ সালে) মাহবুবা রহমানের বড় মগবাজারের বাড়িতে। এখানে তিনি আছেন ১৯৮০ সাল থেকে। সন্তান আর নাতি-নাতনি নিয়ে এখন কেটে যায় তাঁর নিভৃত সময়।

Read at source