ইরান যুদ্ধের বিশ্বায়ন: বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে উসকে পড়া বারুদ
· Prothom Alo

পত্রিকা-হকারের সাইকেল ঘিরে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে তৈরি হওয়া এক ছোট জটলার ধারে দাঁড়াতে হলো অনেকক্ষণ, কোন পত্রিকার পরিবেশন রাজনীতি কেমন, তা নিয়েও বচসা চলল জটলার ভেতর। রাস্তায় সিএনজি কম। জটলা থেকে একজন জানালেন যুদ্ধের কারণে পাম্পে তেল-গ্যাস কম। অবশেষে একটা ইঞ্জিনচালিত রিকশা নিয়ে রওনা হলাম স্টেশনে, পেছনে পড়ে রইল যুদ্ধের বুদ্বুদ।
রিকশাওয়ালা সিরাজ আলীর (ছদ্মনাম) বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, দেড় বছর হয় তার ছোট মেয়ের দেবর দুবাই গেছে, তিন ফসলি একটুকরা জমি বেচে তাকেও টাকা দিতে হয়েছে। ছোট মেয়েটার জন্ম থেকে ডান পা–টা ছোট ছিল বলে বিয়ের সময় যৌতুকের শর্ত ছিল। টাকা আর ফেরত পাবেন কি না জানেন না। ফোন দিয়ে মেয়ে খুব কান্নাকাটি করেছে, যুদ্ধের কারণে দেবরকে নাকি ফেরত আসতে হবে, গামছা দিয়ে হতাশা মুছতে মুছতে দশটা টাকা বেশি চাইলেন।
Visit h-doctor.club for more information.
দুবাইয়ের কথা ওঠতেই জলবায়ু সম্মেলনের সময় দেখা এক বিলাসী শহরের চেহারা মনে ভাসল। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাটাগিরিতে যেখানে সটান আছে এক আধুনিক দাস-বাণিজ্য। দুবাইয়ের বানিয়াস স্কয়ারে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকার ‘বন্দী’ শ্রমিকদের দেখেছিলাম। তাঁরাই দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু দালান বুর্জ খলিফার নির্মাতা।
প্রতিদিন বিকেল থেকে কৃত্রিম আলোর নাচন দেখতে ভিড় জমে এখানে। দিনে প্রতি ঘণ্টায় নাকি ২ লাখ ৫০ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয় এই আধা মাইল লম্বা দালানে। আমি এই বিলাসিতার মর্ম পাঠ করতে পারিনি। আমার সামনে কেবল খালি কলসি হাতে দাঁড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের উপকূল আর বরেন্দ্র অঞ্চলের আধা মাইল লম্বা পানির মিছিল।
রিকশা থেকে নামার আগে সিরাজ আলী জানতে চাইলেন, যুদ্ধ কবে থামবে? অতি ব্যস্ততা দেখিয়ে বলি, এখনি গাড়ি ছেড়ে দেবে। কয়েকজন আমরা যাচ্ছি সুন্দরবন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। ঢাকা ছাড়ার সময় জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষয়াটে গ্রাফিতি দেয়ালগুলো সরে সরে যায়। একটা দেয়ালে আঁকা ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’, খাঁচা ভেঙে উড়ে যাচ্ছে এক পাখি, ঠোঁটে ফুলের ডাল।
পিকাসোর একটি ছবিও আছে হয়তো এমন, পাখির ঠোঁটে শান্তির বার্তা, একবার ঢাকায় কোনো প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখেছিলাম। কিন্তু এত সহস্র শান্তিবার্তা কে শোনে, কে মানে? যুদ্ধ তো থামে না। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম যুদ্ধ জায়েজ হয় সর্বত্র। আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষেরা যুদ্ধবাজ জীব। আমরা যাপিতজীবনের ভেতর দিয়ে যুদ্ধ জারি রাখি। আবার আমরাই পুতুপতু দরদ নিয়ে যুদ্ধবিরোধী মুখস্থ ঘাম ছাড়ি।
গাড়ি ছুটছে পদ্মা সেতু দিয়ে, তলায় চরা নিয়ে পেট উজিয়ে আছে পদ্মা। রেডিওতে যুদ্ধের খবর। ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, ইরান কি লেবাননে পরিচয় হারিয়ে মানুষ হয়ে ওঠছে এক–একটি নিশ্চুপ সংখ্যা। গাড়ির চালক সুদীপ্ত মানখিনের বাড়ি মধুপুর শালবন। একটু পরপর তার ফোন আসছিল। ছোট ভাই ও ভাইয়ের বউ গাজীপুরে পোশাক কারখানায় চাকরি করে। এখনো বেতন পায়নি তারা। ঘরভাড়া বাকি, দোকানে বাকি। কিছু টাকা পাঠানোর জন্য তাই বারবার ফোন।
সামনে তেড়ে আসা গাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে শক্ত ব্রেক করতে হলো। আমরা একটা ঝাঁকুনি খেলাম। ঝাঁকুনির সঙ্গে মনে হলো, যুদ্ধে নিহত মানুষের মতোই রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডেও শ্রমিকেরা এক নির্দয় সংখ্যা হয়ে ওঠেছিল। পোশাক কারখানা বাণিজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক আছে। চেঞ্জিং মার্কেটস ফাউন্ডেশন, জিরো ওয়াস্ট অ্যালায়েনস ইউক্রেন ও স্ট্যান্ড আর্থ যৌথভাবে ‘ড্রেসড টু কিল: ফ্যাশনস ব্র্যান্ডস হিডেন লিংক টু রাশিয়ান অয়েল ইন আ টাইম অব ওয়ার’ নামের একটি গবেষণা পুস্তকে বহু তথ্য–প্রমাণসমেত দেখিয়েছে রাশিয়া এবং চায়নার বহু জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে।
সুন্দরবনে কাজ সেরে আমাদের ঢাকায় ফেরাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। অধিকাংশ পাম্পই বন্ধ। অনেকে সিন্ডিকেট ও মজুতদারির কথা তুললেন, কিন্তু তেল পাওয়া গেল না। পত্রিকাজুড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের তাণ্ডব। পথে পথে তেল-টানাটানির অস্থির অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা ঢাকা ফিরি।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাদেও সহস্র কিসিম ও লহমার যুদ্ধবাজির রক্ত সাক্ষী হয়ে আছে এই গ্রহ। ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ শঙ্কা ও শান নিয়ে বড় হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যুদ্ধ টিকে থাকে ক্রেতা ভোক্তার বেপরোয়া পণ্যমুখিনতার ভেতর। লালসা, লুণ্ঠন আর লেলিহান লাক্সারির লাভাস্রোতে। নয়াউদারবাদী দুনিয়ায় ক্ষমতার দস্তানা বদলায় নয়া হাতের মর্জিতে। ঔপনিবেশিকতা, কর্তৃত্ব, বাইনারি আর বর্ণবাদ বলিষ্ঠ হয় নয়া হেজিমনির রসদে। ধরা যাক পৃথিবীতে কোনো আমেরিকা, চীন, ইসরায়েল বা রাশিয়া নাই। কিংবা তারা অস্ত্র কারখানা ও যুদ্ধকে শস্যের জমিন বা পাঠাগারে বদলে দিয়েছে। তার মানে কি যুদ্ধ থেমে যাবে? আমাদের ভেতরে বুঁদ হয়ে থাকা বিন্দু বিন্দু আমেরিকা বা ইসরায়েল কী রাশিয়া তখন নয়া যুদ্ধমোড়ল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবে। যুদ্ধ খারিজ হতে হবে মগজ, মোহ ও মাতব্বরি থেকে।
আমাদের গাড়ি খুলনার চুকনগর পাড়ি দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বড় গণহত্যা ঘটেছিল এখানে। যুদ্ধদিনের সেই সব স্মৃতিবিস্মৃতি জানতে চুকনগর এসেছিলাম বহু আগে। জেনেছিলাম কেবল মানুষ নয়; অঙ্গার হয়ে গেছিল বহু নোনামাটির ধান, শস্যদানা, গাছলতা আর গ্রামীণ কুটির শিল্প। দেশ স্বাধীন হলেও সেসব আর ফিরে আসেনি। চুকনগর বধ্যভূমি দেখে ইউক্রেনের শিল্পী ইয়ারোসালভা গ্রেসের এক শিল্পকর্মের কথা মনে আসে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের বীজদানা শস্য ও উপকরণ দিয়ে এক চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে। বোমার আগুনে পোড়া ভুট্টা, গাছের বাকল ও মাটি থেকে যুদ্ধের আওয়াজ ভেসে আসছিল। কী নিদারুণ! যুদ্ধে নিহত মাটি, পানির ধারা, শস্যদানা, বৃক্ষরাজি, পাখপাখালি বা লোকজ্ঞানের মর্ম কী এই দুনিয়া কোনো দিন স্মরণ করে?
শ্যামনগর পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যায়, রাস্তায় পানির পাম্পে কলসের লম্বা লাইন আর তেলপাম্পে মোটরসাইকেলের লম্বা লাইন।রাস্তার দুই ধারে ‘কৃষিজমির লাশের’ ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। ধনী দেশের যুদ্ধবাজেরা খাবে বলে কৃষিজমিকে খুন করে বাণিজ্যিক চিংড়ি ও নরমখোলের কাঁকড়া ঘের করা হয়েছে। নলতা মাজারের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে গাজার কথা মনে এল। গাজার তাঁতিরা তৈরি করেন চিকিৎসায় ব্যবহৃত পৃথিবীর বেশির ভাগ ব্যান্ডেজ গজ কাপড়। নলতাতেও কিছু তাঁতি সম্প্রদায় আছে, যারা এই ব্যান্ডেজ গজ কাপড় বানাতে জানে। যেভাবে যুদ্ধ বিস্তৃত হচ্ছে বিশ্বময়, জখম ঢাকার মতো এত ব্যান্ডেজ কী আর তৈরি করতে পারবে পৃথিবী?
পদ্মা সেতুর পর আর সিএনজি গ্যাস পাওয়া যায় না দক্ষিণে। একের পর এক তেলপাম্প আমাদের ফিরিয়ে দিল। লিখে রেখেছে তেল নাই, পেট্রল নাই, ডিজেল নাই। অকটেন নাই। রাস্তায় কাজ চলছে বলে আমরা আশাশুনির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কালীগঞ্জ শ্রীরামপুর ফুলতলা মোড়ে কৃষকের ধানজমিন দখল করে বিষের বিজ্ঞাপন দিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি সিনজেনটা। একই জমিতে নানা কিসিমের বিষ। রিফিট, গ্রোজিন, এমিস্টার টপ, ফিলিয়া, থিয়োভিট, ভিরতাকো, ইনসিপিয়ো।
২০১৭ সালে ক্যামচায়না এই সিনজেনটা কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করে, সামরিক-শিল্পায়নে যুক্ততাসহ চায়না সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে ক্যামচায়নার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভেতরেও রাশিয়াতে কৃষিপণ্যের বাণিজ্য অব্যাহত রেখে বিতর্কিত হয়েছিল সিনজেনটা। কেবল সিনজেনটা নয়; বহুজাতিক বিষ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অস্ত্রকারখানা ও যুদ্ধের সম্পর্ক আছে। অস্ত্র আর কৃষিবিষ কোম্পানিরা যমজ। কৃষিতে ব্যবহৃত বহু কীটনাশক কিংবা আগাছানাশক সামরিক গবেষণাগার থেকে তৈরি হওয়া।
কৃষিবিষ বাজারের ৪০ ভাগ দখলদার অর্গানোফসফেট একই সঙ্গে রাসায়নিক অস্ত্রেও ব্যবহৃত হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে রাসায়নিক কোম্পানিগুলো অস্ত্র উৎপাদনেও যুক্ত হয়। মনস্যান্টো এজেন্ট অরেঞ্জ বিষ ব্যবহার করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবন্দীদের হত্যার জন্য রাসায়নিক উৎপাদন এবং বন্দিশিবিরে অন্যায় দাসপ্রথা বহাল রাখার জন্য বায়ার কোম্পানি বহুবার ধিক্কৃত হয়েছে। মনস্যান্টোর রাউন্ডআপ শাকলতা হত্যাকারী, সাদা ফসফরাস ব্যবহৃত হয় সামরিক অস্ত্র কারখানায়। আজকের বিষনির্ভর কৃষিপ্রকল্প শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে যুদ্ধের কথা বলেই, ‘ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’।
শ্যামনগর পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যায়, রাস্তায় পানির পাম্পে কলসের লম্বা লাইন আর তেলপাম্পে মোটরসাইকেলের লম্বা লাইন। পানি–সংকটের সঙ্গে তেল–সংকট। এই পানি তুলতেও বিদ্যুৎ কী তেলেরই দরকার। সুন্দরবন লাগোয়া মুন্সিগঞ্জ কলবাড়ি বাজারে চিংড়ি-কাঁকড়া আড়তে যুদ্ধের আড্ডায় শঙ্কিত বনজীবীদের মুখ। ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে চিংড়ি রপ্তানি ৩০-৪০ ভাগ কমেছিল। মূলধন হারিয়ে অনেকে পেশা বদলেছিলেন তখন। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও বিমা খরচ বাড়ছে। বহু রুট বন্ধ হওয়াতে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে।
এক ভোরে মীরগাং-যতীন্দ্রনগর হয়ে চুনকুড়ি গ্রামে যাই। মীরগাং-যতীন্দ্রনগরে কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের প্রাচীন বসতি। যুদ্ধে নিহত ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর আলাপ টেনে এক প্রবীণ কান্না করে দিলেন। ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে নিমাই মণ্ডলসহ অনেক জেলেই মাছ ধরতে যাননি, চুনকুড়ির রাস্তায় বসে তাস খেলছিলেন। আর কিছুদিন বাদেই মধু-মৌসুম শুরু হবে। তেল–সংকটের কারণে মধু সংগ্রহের খরচও বাড়বে বলে জানান মৌয়ালিরা। শুনলাম পদ্মপুকুর ও গাবুরার অনেক সমুদ্রগামী জেলের বরগুনায় যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তেল–সংকট বাড়লে সমুদ্রগামী জেলেদের জীবিকায় টান পড়বে।
সুন্দরবনে কাজ সেরে আমাদের ঢাকায় ফেরাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। অধিকাংশ পাম্পই বন্ধ। অনেকে সিন্ডিকেট ও মজুতদারির কথা তুললেন, কিন্তু তেল পাওয়া গেল না। পত্রিকাজুড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের তাণ্ডব। পথে পথে তেল-টানাটানির অস্থির অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা ঢাকা ফিরি।
ঈদের টানা ছুটিতে আসি নেত্রকোনা। আমরা যাব ধরের বাংলা গ্রামে। অটোড্রাইভার ছত্তার মিয়ার আসতে দেরি হলো। ৬ ঘণ্টা করে দিনে দুইবার কিংবা সারা রাত ১২ ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়। সারা দিন ৮ ঘণ্টা অটো চালিয়ে হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ থাকছে না। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে বোরো মৌসুম। খুব কায়দা করে নানা জায়গা ঘুরে ৬ ঘণ্টা চার্জ দিতে পারছেন। অটো চালানোর সময় কমেছে, আয় কমেছে ২০০–৩০০ টাকা। বন্নী, দিগজান, সিধলী গ্রাম ঘুরে শোনা গেল, ‘বাজারে আগুন, কারেন্ট নাই, তেল নাই পাম্পে, বাস-ট্রাক খুব সমস্যায় পড়ছে। গ্রাম থেকে দুধ, ডিম, সবজি বিক্রির জন্য সহজে শহরে পাঠানো যাচ্ছে না।’
গ্রামের সোহেল মিয়া রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করেন। দুপুরের পর তাঁকে কাজ থেকে চলে যেতে হবে, রান্না বসানো লাগবে, বাসভাড়া বাড়ায় তাঁর স্ত্রী বিলকিস চারজনের সঙ্গে রওনা দিয়েছিলেন লোকালে, ইফতারের আগে পৌঁছাবেন। সুনামগঞ্জ থেকে বাংলা গ্রামে এসেছেন শিক্ষক লিক্সন তালুকদার। জানালেন, তেল–সংকটের কারণে বাইক ও স্পিডবোটের ভাড়ায় অনেকেই ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা বদলাচ্ছেন। জামালগঞ্জের মান্নান ঘাট থেকে ধর্মপাশার মধুপুর পর্যন্ত স্পিডবোটে আগে ৩০০ নিত, এখন ৫০০ টাকা নিয়েছে। একটি স্পিডবোটে আসা-যাওয়ায় প্রায় ৩৬ লিটার তেল লাগে। স্পিডবোটের সংখ্যা না কমলেও তেল ‘কালোবাজারি’ হচ্ছে। হাতে বাওয়া নৌকা নেই বললেই চলে, তাই তেলনির্ভর নৌযানই এখন ভরসা।
মধ্যনগরের হরিপুর থেকে নেত্রকোনায় ডাক্তার দেখিয়ে বাংলা গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছেন রুশা ও তাঁর মা। বসন্ত হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে হাওরের গ্রামে। হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। মধ্যনগরের হাওরে জমিনে এক বিঘত উঁচু হয়ে শিল পড়েছে। বোরো ধানের জমিন সব লন্ডভন্ড। মোবাইলে দেখলাম রংপুর-বগুড়ায় আলু ফসলের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে এই চৈতা বৃষ্টিতে।
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে চলেছেন, অতিবৃষ্টি কী অনাবৃষ্টির মতো জলবায়ুর এই উল্টাপাল্টা আচরণ বাড়ছে বেহিসাবি জীবাশ্ম জ্বালানি ও কার্বণ নিঃসরণের কারণে। কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী কারণগুলোর অন্যতম কারণ অস্ত্র উৎপাদন ও যুদ্ধবাণিজ্য। যুদ্ধ তাই আজ গাজা কী তেহরান বা হরমুজ প্রণালিতে ঢেকে রাখা যায় না। যুদ্ধের উত্তাপ কী মারদাঙ্গার বাণিজ্যিক ও প্রাকৃতিক বিশ্বায়ন ঘটে। যার বাইরে বাংলাদেশের কোনো গ্রামও বাদ থাকে না।
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যুদ্ধই নানাভাবে প্রভাবিত ও বিক্ষত করে সর্বপ্রান্তকে। আজকের নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের দুনিয়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই বারবি পুতুল বা কোমল পানীয়র মতোই। কারণ, যুদ্ধ জারি ও জায়েজ হওয়ার শর্ত ও কারিগরিগুলো প্রতিষ্ঠিত থাকে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, জ্বালানি, বাণিজ্য, মুনাফা, লুণ্ঠন, বাজার ও দখলবাজির মাধ্যমে। কেবল রাষ্ট্রপক্ষীয় কূটনীতি কিংবা মুনাফার ভাগাভাগি নয়; পৃথিবীর প্রতিজন মানুষ যাপিতজীবনের ভেতর দিয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে বারুদের বাহাদুরি থামবে না।
পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)