গাছ রেখেও একটা মনোরম ঈদগাহ বানানো যায়
· Prothom Alo

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে ছিল ৭৫ একরের এক বৃক্ষহীন ধুধু ক্যাম্পাস। তারপর গাছ লাগানো শুরু হয়, যেমন হয় সব প্রতিষ্ঠানে। আমাদের দেশে সাধারণত বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ আর কোনো অতিথি গেলে আনুষ্ঠানিকতার বাগাড়ম্বরে লাগানো হয় গাছ। ঠিকাদারদের দিয়ে চলে গাছ লাগানোর চর্চা। কেউ চম্বল লাগিয়ে নাম দেয় প্যারিস রোড, কেউ প্রাকৃতিক কাঁঠালগাছ তুলে দিয়ে পুঁতে ফেলে একাশিয়া। দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসে হাঁপানি/অ্যাজমা।
Visit cat-cross.com for more information.
সেদিক থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। কতিপয় গাছ–খ্যাপাটে শিক্ষক আর শিক্ষার্থী মিলে ক্যাম্পাসকে পরিণত করে এক মোহনীয় বৃক্ষ সংগ্রহশালায়, উন্মুক্ত বোটানিক্যাল গার্ডেনে। ৩৫০টির বেশি প্রজাতির বৃক্ষ আছে এখানে। আছে মোট ৩৬ হাজারের বেশি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও দুর্লভ প্রজাতির গাছ। ফাদার টিম, দ্বিজেন শর্মারা যেমনটি চেয়েছিলেন, প্রায় সে রকমভাবেই যেন গড়ে উঠছিল ক্যাম্পাস।
উদাল, সমুদ্রজবা, মাধবীলতা, মণিমালা, হাতিবেল, ডম্বিয়া, গ্লিরিসিডিয়া, বসন্তমঞ্জরি (ফাল্গুনমঞ্জরি), ‘ছদ্মশিমুল’ বান্দরহুলা, চায়না ডল, নহিচিচা বা লাল উদাল, খই-বাবলা বা জিলাপিগাছ, বক্সবাদাম, মণিমালাগাছ, কনকচাঁপা, অশোক, নীলমণিলতা, পালাম কুরচি, কাঁঠালচাঁপা, সোনাপাতি, নাগলিঙ্গম, মহুয়া, সুলতানচাঁপা, কইনার, বনআসরা, স্বর্ণচাঁপা—কী নেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে।
সবার অগোচরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের এক সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে, তাকে রক্ষা আর প্রসার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে দেশের তাবৎ পরিবেশসচেতন আর বৃক্ষদরদি মানুষকে দরদ আর দায় নিয়ে জোট বাঁধতে হবে। দাঁড়াতে হবে শহীদ আবু সাঈদের মতো পাহাড় হয়ে।
সবার সবকিছু সয় না, তাই ১১ মার্চ করাত–কুড়ালের আঘাতে অনেক গাছকে ধরাশায়ী করা হয়। সেদিন সকাল থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনের নানা প্রজাতির গাছ এলোপাতাড়িভাবে কাটা শুরু করেন ঠিকাদারের লোকজন। এর আগে ইরান যুদ্ধের অজুহাতে ঈদের ছুটি এগিয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। জ্বালানি বাঁচবে? সে অন্য আলোচনা।
বলা বাহুল্য, এই আচমকা ঘোষণায় অনেক শিক্ষার্থীই চটজলদি বাড়ি ফিরতে পারেনি। অনেকেই আগাম টিকিট কেটে রেখেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে তাল রেখে। টিকিট বদল বা টাকা ফেরত—কোনোটাই এখন আর সম্ভব নয়। তা ছাড়া আছে টিউশন হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি। ভ্যাগিস সবার যাওয়া সম্ভব হয়নি, তাই অবশিষ্ট শিক্ষার্থীরা বাধা দিতে পেরেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ কাটার আয়োজন আপাতত বন্ধ হয়েছে।
গাছ কাটার অজুহাত
গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তি মারফত গাছ কাটার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, মন্দিরের স্থান, ছেলেদের হল ও বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা কিছুসংখ্যক গাছ কর্তন করা হবে। তবে ‘প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা’—এমন এক ঈদগাহের খোয়াব নিয়েই প্রস্তাবিত এলাকার গাছ কাটা শুরু হয়।
প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা এককাট্টা হওয়ার আগেই করিতকর্মা গাছ কাটারুরা প্রায় ৪৫টি গাছ মাটিতে ফেলে দেয়। প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বলা হয়—গাছের জঙ্গল হয়ে গেছে, বড় গাছের সঙ্গে পাল্লায় কিছু কিছু গাছ অপুষ্টিতে ভুগছে, বড় হচ্ছে না, তাই তাদের চিরবিশ্রাম দেওয়া দরকার। গাছের কারণে নামাজ পড়তে কষ্ট হয়, নামাজের কাতার ত্যাড়াবাঁকা হয়ে যায়। কাতারের মাঝাখনে গাছ পড়ে, তাই তাদের কেটে ফেলা হবে। বলা বাহুল্য, এসব চিড়া ভেজানো কথায় শিক্ষার্থীদের মন ভেজেনি; বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীর ভিড় বাড়তে থাকে। একসময় গাছ কাটা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে অবস্থান নেয় সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
যখন খুশি গাছ কেটে ফেলা যায় কি
গত জানুয়ারি ২০২৫ উচ্চ আদালত পরিষ্কার করে বলে দেন, গাছ কাটতে সরকারের অনুমোদন লাগবে। আদালত পরিবেশ অধিদপ্তরকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে গাছ কাটার অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার জন্য একটি কমিটি এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৃথক কমিটি হবে।
এর মধ্যে ঢাকার ক্ষেত্রে পরিবেশবাদী, পরিবেশবিশেষজ্ঞ, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন আদালত। অপর নির্দেশনায় আদালত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে সাত দিনের মধ্যে সার্কুলার জারি করে জেলা প্রশাসক, জেলা পরিবেশ কর্মকর্তা, সরকারি কলেজের অধ্যাপক, সমাজকর্মী, পরিবেশবিদ, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক ও জেলা সিভিল সার্জনকে নিয়ে জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে বলেন।
উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে সাত দিনের মধ্যে সব জেলা প্রশাসকের প্রতি একটি সার্কুলার জারির নির্দেশ দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কলেজের অধ্যক্ষ, সমাজকর্মী, পরিবেশকর্মী, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, এসি ল্যান্ড ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে হবে এ কমিটি। এ তো গেল গাছ কাটার অনুমতিসংক্রান্ত পদ্ধতির ক্যাচাল। মোদ্দাকথা, সে আপনি যে–ই হোন না কেন, গাছে কুড়াল–করাত বসানোর আগে গাছের বিস্তারিত বৃত্তান্ত জানিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতেই হবে।
কিন্তু অনুমতি ছাড়া গাছ কাটলে কী বিধান হবে? সেটাও স্পষ্ট করে অন্তর্বর্তী সরকার ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ’, ২০২৬ (২০২৬ সালের ০৮ নম্বর অধ্যাদেশ) জারি করে। এ অধ্যাদেশের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(৪) যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা, করপোরেশন, অধিদপ্তর, বোর্ড, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই অধ্যাদেশ বা তদধীন প্রণীত কোনো বিধির অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইলে বা কোনো বিধান লঙ্ঘিত হইলে উক্ত অপরাধ বা লঙ্ঘনের সহিত প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে উক্ত সংস্থার এমন প্রত্যেক পরিচালক, নির্বাহী ব্যবস্থাপক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিনিধি, যে নামেই অভিহিত হউক, উক্ত অপরাধ সংঘটন বা বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং এইরূপ অপরাধের জন্য আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করিতে পারিবেন।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে তাৎক্ষণিকভাবে গাছ কাটা বন্ধ করতে পেরেছেন। কিন্তু কাউকে না কাউকে আইনের পথে হাঁটতেই হবে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আর অধ্যাদেশের রশি ধরে আদালতের একটা নিষেধাজ্ঞা আদেশ বা ইনজাংশন তাদের নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেশের আইন না মানার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দৃষ্টিতে বিষয়টি আনাও জরুরি। কমিশন নিজেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বৃক্ষ রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে।
সবার অগোচরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের এক সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে, তাকে রক্ষা আর প্রসার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে দেশের তাবৎ পরিবেশসচেতন আর বৃক্ষদরদি মানুষকে দরদ আর দায় নিয়ে জোট বাঁধতে হবে। দাঁড়াতে হবে শহীদ আবু সাঈদের মতো পাহাড় হয়ে।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব