পৃথিবী বদলে দেওয়া যে ১১টি উদ্ভাবনের পেছনে ছিলেন নারী বিজ্ঞানীরা
· Prothom Alo

ইতিহাসের সেরা উদ্ভাবকদের নাম বলতে বললে অবলীলায় টমাস আলভা এডিসন, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল কিংবা লেওনার্দো দা ভিঞ্চির নাম চলে আসে। কিন্তু মেরি অ্যান্ডারসন বা অ্যান সুকামোতো সম্পর্কে আমরা কতটা জানি? হয়তো তাঁদের নাম অনেকের কাছেই অপরিচিত, কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনেক বস্তু এবং বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের পেছনে রয়েছে এই অকুতোভয় নারী উদ্ভাবকদের মেধা। বিশ্বজুড়ে নারীরা বড় বড় সমস্যা সমাধানে নিজস্ব উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছেন। এমন ১১টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের তথ্য জেনে নিন, যার পেছনে ছিলেন নারীরা।
অ্যাডা লাভলেসবিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার—অ্যাডা লাভলেস
অ্যাডা লাভলেসকে (১৮১৫–১৮৫২) বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৮৪৩ সালে তিনি চার্লস ব্যাবেজের অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের জন্য বার্নোলি সংখ্যা গণনার একটি নির্দেশিকা তৈরি করেন, যা ছিল যন্ত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণের জন্য তৈরি ইতিহাসের প্রথম অ্যালগরিদম। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কম্পিউটার কেবল সংখ্যা নয়, বরং চিহ্নের মাধ্যমে সংগীত বা গ্রাফিকসও তৈরি করতে সক্ষম। ব্যাবেজের ইঞ্জিনের ওপর কাজ করার সময় তিনি নোটস এ-জি নামে বিস্তারিত নোট লেখেন, যেখানে বার্নোলি সংখ্যা গণনার পদ্ধতি বর্ণিত ছিল। অ্যাডা কল্পনা করেছিলেন পাঞ্চ কার্ড ব্যবহার করে যন্ত্রের মাধ্যমে তথ্য ও নির্দেশের সমন্বয়ে জটিল কাজ সম্ভব। অ্যাডা মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি ওড়ার জন্য ডানা ডিজাইন করেছিলেন এবং পাখি নিয়ে ‘ফ্লাইওলজি’ নামে একটি বই লিখেছিলেন।
Visit chickenroad.qpon for more information.
গ্রেস হপারকম্পিউটার সফটওয়্যার—গ্রেস হপার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর রিয়ার অ্যাডমিরাল গ্রেস হপারকে মার্ক–১ নামে নতুন একটি কম্পিউটারে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৫০ দশকে তিনি কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের একদম সামনের সারিতে চলে আসেন। তিনি উদ্ভাবন করেন কম্পাইলার, যা মানুষের দেওয়া নির্দেশকে কম্পিউটারের বোধগম্য সংকেতে রূপান্তর করতে পারত। এটি প্রোগ্রামিংকে দ্রুততর করে এবং কম্পিউটারের কার্যপদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটায়। এমনকি বর্তমানে ব্যবহৃত ডি-বাগিং শব্দটি তিনিই জনপ্রিয় করেন। অ্যামেজিং গ্রেস নামে পরিচিত এই নারী ৭৯ বছর বয়স পর্যন্ত নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কম্পিউটারের সঙ্গে কাজ করে গেছেন।
শার্লি অ্যান জ্যাকসনকলার আইডি ও কল ওয়েটিং—শার্লি অ্যান জ্যাকসন
যুক্তরাষ্ট্রের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ শার্লি অ্যান জ্যাকসনের ১৯৭০ দশকের গবেষণার ফসল হলো আজকের কলার আইডি এবং কল ওয়েটিং প্রযুক্তি। টেলিযোগাযোগে তাঁর এই যুগান্তকারী কাজ অন্যদের জন্য পোর্টেবল ফ্যাক্স, ফাইবার অপটিক কেবল এবং সোলার সেল উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করেছে। তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি অর্জনকারী প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী।
মেরি অ্যান্ডারসনউইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার—মেরি অ্যান্ডারসন
১৯০৩ সালের এক শীতের দিনে নিউইয়র্ক ভ্রমণের সময় মেরি অ্যান্ডারসন লক্ষ করেন, চালককে বারবার জানালা খুলে হাত দিয়ে গাড়ি উইন্ডস্ক্রিনের ওপর থেকে তুষার সরাতে হচ্ছে। প্রতিবার জানলা খোলায় গাড়ির যাত্রীরা তীব্র শীতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। মেরি তখনই গাড়ির ভেতর থেকে চালানো যায় এমন একটি রাবার ব্লেডের নকশা তৈরি করেন এবং ১৯০৩ সালে এর পেটেন্ট পান। তবে তৎকালীন গাড়ি কোম্পানি ভেবেছিল এটি চালকের মনোযোগ নষ্ট করবে, তাই শুরুতে এটি সফল হয়নি। মেরি তাঁর এই উদ্ভাবন থেকে কখনো আর্থিক লভ্যাংশ পাননি, যদিও পরবর্তী সময়ে সব গাড়িতে এটি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।
ওলগা ডি গঞ্জালেজ-সানাব্রিয়াস্পেস স্টেশন ব্যাটারি—ওলগা ডি গঞ্জালেজ-সানাব্রিয়া
লং সাইকেল-লাইফ নিকেল-হাইড্রোজেন ব্যাটারি—নামটি শুনতে খুব জুতসই না হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে সচল রাখতে এই ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। পুয়ের্তোরিকো বংশোদ্ভূত ওলগা ১৯৮০ দশকে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। তিনি বর্তমানে নাসার গ্লেন রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক হিসেবে কর্মরত।
জোসেফিন ককক্রেনডিশওয়াশার—জোসেফিন ককক্রেন
বাড়িতে নিয়মিত অতিথিদের আপ্যায়ন করতে হতো জোসেফিনকে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি যন্ত্র, যা ভৃত্যদের চেয়েও দ্রুত থালাবাসন ধুয়ে দেবে এবং ভেঙে ফেলার ভয় থাকবে না। একটি তামার বয়লারের ভেতর মোটরের সাহায্যে চাকা ঘুরিয়ে পানির চাপের মাধ্যমে ধোয়ার এই পদ্ধতিটিই ছিল বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় ডিশওয়াশার। মদ্যপ স্বামী মারা যাওয়ার পর বিপুল ঋণের চাপে পড়ে তিনি ১৮৮৬ সালে এটি পেটেন্ট করেন এবং নিজস্ব কারখানা গড়ে তোলেন।
মারি ভ্যান ব্রিটান ব্রাউনহোম সিকিউরিটি সিস্টেম—মারি ভ্যান ব্রিটান ব্রাউন
পেশায় নার্স মারি প্রায়ই বাড়িতে একা থাকতেন। ১৯৬০ দশকে অপরাধের ক্রমবর্ধমান হার এবং পুলিশের ধীরগতির প্রতিক্রিয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। তাঁর স্বামী অ্যালবার্টের সহায়তায় তিনি এমন একটি ক্যামেরা তৈরি করেন, যা মোটরের সাহায্যে দরজার ওপর-নিচ চলাফেরা করে পিপ-হোল দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখাত। তার শোবার ঘরের মনিটরে একটি অ্যালার্ম বাটনও যুক্ত ছিল। এটিই ছিল আধুনিক হোম সিকিউরিটি সিস্টেমের পূর্বসূরি।
অ্যান সুকামোতোস্টেম সেল আইসোলেশন—অ্যান সুকামোতো
১৯৯১ সালে পেটেন্ট করা অ্যান সুকামোতোর এই গবেষণা ক্যানসার রোগীদের রক্ত সংবহনতন্ত্র বুঝতে বিশাল অগ্রগতি এনে দিয়েছে। তাঁর এই উদ্ভাবন ভবিষ্যতে ক্যানসারের নিরাময় খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে। তিনি বর্তমানে স্টেম সেল বৃদ্ধির ওপর আরও গবেষণা করছেন এবং আরও সাতটি উদ্ভাবনের সহ-পেটেন্টধারী।
স্টেফানি কোলেককেভলার—স্টেফানি কোলেক
রসায়নবিদ স্টেফানি কোলেক এমন একটি হালকা ওজনের তন্তু উদ্ভাবন করেন, যা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট এবং বডি আর্মার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬৫ সালে আবিষ্কৃত এই উপাদানটি ইস্পাতের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে এটি গৃহস্থালির গ্লাভস, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে অ্যারোপ্লেন এবং সাসপেনশন ব্রিজেও ব্যবহৃত হয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে।
এলিজাবেথ ম্যাগিবোর্ড গেম মনোপলি—এলিজাবেথ ম্যাগি
ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় বোর্ড গেম মনোপলি তৈরির কৃতিত্ব প্রায়ই চার্লস ড্যারোকে দেওয়া হয়, কিন্তু এর মূল নিয়ম উদ্ভাবন করেছিলেন এলিজাবেথ ম্যাগি। ১৯০৪ সালে পেটেন্ট করা তার এই গেমটির নাম ছিল দ্য ল্যান্ডলর্ডস গেম। তিনি পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজমের কুফল দেখানোর জন্য এই খেলাটি তৈরি করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে পার্কার ব্রাদার্স কোম্পানি মাত্র ৫০০ ডলারে ম্যাগির কাছ থেকে পেটেন্টটি কিনে নিয়ে গেমটিকে মনোপলি নামে বাজারজাত করে।
হেডি লামারওয়াই–ফাইসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি—হেডি লামার
হেডি লামার (১৯১৪–২০০০) ছিলেন একাধারে হলিউডের নামী অভিনেত্রী এবং প্রখর মেধার অধিকারী এক উদ্ভাবক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে তিনি সুরকার জর্জ অ্যান্থেইলের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম পেটেন্ট করেন। এটি ছিল রেডিও-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডোকে শত্রুদেশের জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার হাত থেকে রক্ষা করার একটি পদ্ধতি। তাদের এই উদ্ভাবন ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং স্প্রেড স্পেকট্রাম প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা প্রেরক ও গ্রাহক যন্ত্রের মধ্যে সংকেতের কম্পাঙ্ক দ্রুত পরিবর্তনের মাধ্যমে যোগাযোগকে সুরক্ষিত রাখে। যদিও তৎকালীন নৌবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এটি ব্যবহার করেনি, তবে এই প্রযুক্তিই আজকের আধুনিক ব্লুটুথ, ওয়াই-ফাই এবং জিপিএস–ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সূত্র: বিবিসি ও ব্রিটানিকা