থ্যাচার ইফেক্ট: অস্বাভাবিক ছবি উল্টো করে দেখলে স্বাভাবিক লাগে কেন
· Prothom Alo

আজ একটা মজার খেলা দিয়ে শুরু করা যাক। কল্পনা করুন, আপনার সামনে যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের দুটি ছবি রাখা আছে। ছবি দুটি উল্টো করে রাখা। মানে মাথা নিচে, কিন্তু থুতনি ওপরে। একনজরে দেখলে মনে হবে, দুটো ছবিই একদম ঠিকঠাক। একই মানুষ, একই হাসি, একই চোখ। কোনো ঝামেলাই নেই।
কিন্তু যখনই আপনি ছবিগুলো সোজা করবেন, মানে মাথা ওপরের দিকে করবেন এবং থুতনি নিচের দিকে যাবে, অমনি ছবির অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করবেন। দেখবেন, একটি ছবিতে মার্গারেট থ্যাচারকে স্বাভাবিক লাগছে, কিন্তু অন্যটিতে তাঁকে লাগছে ভয়ংকর কোনো দানবের মতো! তাঁর চোখ দুটি উল্টে আছে, হাসির ভঙ্গিটা বিকৃত। অথচ উল্টো অবস্থায় থাকার সময় আপনি বুঝতেই পারোনি, ছবিটার ভেতরে এত বড় ঘাপলা লুকিয়ে আছে।
Visit forestarrow.help for more information.
থ্যাচার ইফেক্টএই যে আমাদের মস্তিষ্ক উল্টো ছবিতে বিকৃতি ধরতে পারে না, কিন্তু সোজা করলেই ভড়কে যায়, বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় থ্যাচার ইফেক্ট। হ্যাঁ, মার্গারেট থ্যাচারের নামানুসারেই এমন নামকরণ করা হয়েছে।
কেন এমন অদ্ভুত নাম হলো
ঘটনাটা ১৯৮০ সালের। যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিটার থম্পসন প্রথম এই বিষয়টি সবার সামনে আনেন। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের একটি ছবির ওপর এই পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন বলেই এর নাম হয়ে যায় থ্যাচার ইফেক্ট। তিনি থ্যাচারের ছবির চোখ ও ঠোঁট দুটিকে কেটে উল্টো করে বসিয়ে দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, যখন পুরো ছবিটা উল্টো করে দেখানো হলো, কেউ বুঝতেই পারল না যে চোখ এবং ঠোঁট বিকৃত করা হয়েছে!
ম্যান্ডেলা ইফেক্ট: স্মৃতিভ্রম নাকি প্যারালাল ইউনিভার্সআমাদের মস্তিষ্ক উল্টো ছবিতে বিকৃতি ধরতে পারে না, কিন্তু সোজা করলেই ভড়কে যায়, বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় থ্যাচার ইফেক্ট।
কেন এমন হয়
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের সুপার-কম্পিউটার খ্যাত মস্তিষ্ক কেন এত বোকা বনে যায়? সোজা ছবিতে যে ভুলটা এক সেকেন্ডে ধরা পড়ে, উল্টো ছবিতে সেটা কেন অদৃশ্য হয়ে যায়?
মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের টিকে থাকার জন্য একে অপরের মুখ চেনা খুব জরুরি। বন্ধু নাকি শত্রু, সেটা বোঝার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক মানুষের মুখ চেনার ব্যাপারে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে।
সাধারণত আমরা যখন কারও মুখ দেখি, তখন মস্তিষ্ক সেটাকে সামগ্রিকভাবে দেখে। মানে চোখ, নাক, মুখ সব আলাদা আলাদা করে না দেখে পুরো মুখটা একটা মানচিত্রের মতো দেখে। চোখ দুটি নাকের কতটা ওপরে, ঠোঁটের দূরত্ব কতটুকু; এই পুরো জ্যামিতিক বিন্যাসটা সে একনজরে মেপে ফেলে। একে বলা হয় কনফিগারাল প্রসেসিং।
অচেনা রাস্তায় মস্তিষ্ক কীভাবে নতুন পথ খুঁজে নেয়মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের টিকে থাকার জন্য একে অপরের মুখ চেনা খুব জরুরি। বন্ধু নাকি শত্রু, সেটা বোঝার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক মানুষের মুখ চেনার ব্যাপারে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন মুখটা উল্টে দেওয়া হয়। আমাদের মস্তিষ্ক উল্টো মুখ দেখতে অভ্যস্ত নয়। কারণ বাস্তবে আমরা মানুষকে উল্টো হয়ে হাঁটতে দেখি না!। তাই উল্টো ছবি দেখলে মস্তিষ্কের ওই সামগ্রিক দেখার ক্ষমতাটা কাজ করে না। তখন মস্তিষ্ক তার দেখার পদ্ধতি বদলে ফেলে। সে তখন চলে যায় ফিচারাল প্রসেসিংয়ে।
সহজ করে বললে, সোজা ছবি দেখার সময় মস্তিষ্ক পুরো সিনারি দেখে। কিন্তু উল্টো ছবি দেখার সময় সে একটা তালিকার মতো কাজ করে। সে তখন পুরো মুখের জ্যামিতি বোঝে না, শুধু পার্টসগুলো চেক করে। যেমন, চোখ আছে? হ্যাঁ, আছে। নাক আছে? হ্যাঁ, আছে। ঠোঁট আছে? হ্যাঁ, আছে।
উল্টো ছবিতে মস্তিষ্ক পুরো মুখের জ্যামিতি বোঝে না, শুধু পার্টসগুলো চেক করেব্যস! মস্তিষ্ক তখন গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে দেয় যে, সব ঠিক আছে। চোখ বা ঠোঁট যে আসলে উল্টে আছে, সেটা সে খেয়ালই করে না। কারণ আলাদাভাবে দেখলে উল্টো চোখকেও চোখের মতোই লাগে, উল্টো ঠোঁটকেও ঠোঁটের মতোই লাগে। কিন্তু যখন ছবিটা সোজা করা হয়, তখন মস্তিষ্ক আবার তার সামগ্রিক দেখার মোডে ফিরে আসে। তখনই সে ধরে ফেলে যে, মুখের আকৃতি মিলছে না! চোখ ও ঠোঁট তো ভুল জায়গায় বসানো! তখনই আমরা আঁতকে উঠি।
মস্তিষ্ক কি একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারেসোজা ছবি দেখার সময় মস্তিষ্ক পুরো সিনারি দেখে। কিন্তু উল্টো ছবি দেখার সময় সে একটা তালিকার মতো কাজ করে। সে তখন পুরো মুখের জ্যামিতি বোঝে না, শুধু পার্টসগুলো চেক করে।
মস্তিষ্কে তখন কী ঘটে
আমাদের মস্তিষ্কের একটা বিশেষ অংশ আছে, নাম ফিউজিফর্ম ফেস এরিয়া (FFA)। এই অংশটার কাজই হলো মানুষের মুখ চেনা। সোজা মুখ দেখলে এই অংশটা খুব একটিভ থাকে। কিন্তু যখনই মুখ উল্টে দেওয়া হয়, তখন এই FFA অংশটা কাজ করা কমিয়ে দেয়। তখন দায়িত্ব চলে যায় মস্তিষ্কের অন্য অংশের ওপর, যারা চেয়ার, টেবিল, বা কলমের মতো সাধারণ বস্তু চিনতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্কের ফিউজিফর্ম ফেস এরিয়া অংশটার কাজ হলো মানুষের মুখ চেনাচেয়ার বা টেবিল উল্টো করে রাখলেও সেটা চেয়ার বা টেবিলই থাকে, তার কোনো ভয়ংকর পরিবর্তন হয় না। তাই মস্তিষ্কের ওই সাধারণ অংশটা মুখের বিকৃতি ধরতে পারে না। সে মনে করে, সব তো ঠিকই আছে, এত ভাবার কী আছে!
কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ
আপনার কাছে মনে হতে পারে, এটা তো নিছক একটা চোখের ধাঁধা। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এটা বিশাল এক আবিষ্কার। এই ইফেক্ট প্রমাণ করে, আমাদের মস্তিষ্ক মানুষের মুখ ও অন্য কোনো বস্তুকে একভাবে দেখে না। মুখের জন্য তার আলাদা ব্যবস্থা আছে।
এই গবেষণা থেকেই বিজ্ঞানীরা ফেস ব্লাইন্ডনেস রোগ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। যাদের এই রোগ আছে, তারা নিজের পরিচিত মানুষের মুখও চিনতে পারে না। থ্যাচার ইফেক্ট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা যা দেখি, তা সব সময় সত্যি নয়। আমাদের মস্তিষ্ক মাঝেমধ্যেই শর্টকাট নিতে গিয়ে এমন ভুল করে বসে।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকাসূত্র: আইএফএল সায়েন্সস্বাভাবিক মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই